ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ গ্রামে কলেজছাত্র সুমন শেখ (২৪) হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও থামেনি সহিংসতা ও সংঘাতের তাণ্ডব। হত্যাকাণ্ডের প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রতিশোধের নামে প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে দফায় দফায় হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও সর্বস্ব লুটপাটের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নিরাপত্তার চরম সঙ্কটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অধিকাংশ সদস্য গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় বড়ভাগ গ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ এখন প্রায় জনশূন্য অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, দিনের আলোয় একের পর এক ধ্বংসাত্মক হামলার ঘটনা ঘটলেও তা প্রতিরোধে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো জোরালো তৎপরতা দেখা যায়নি।
সরেজমিনে বড়ভাগ গ্রামের বিভিন্ন পাড়া ঘুরে দেখা গেছে, অন্তত আট থেকে দশটি পাকা ও আধাপাকা বসতবাড়িতে চালানো হয়েছে এক ভয়ংকর তাণ্ডব। প্রতিটি বাড়ির প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা। হামলার ভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা আগেভাগেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন। পুরো গ্রামজুড়ে এক ধরনের থমথমে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অতিরিক্ত ভীতির কারণে স্থানীয় অনেকেই নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে বা এ বিষয়ে মুখ খুলতে পর্যন্ত চরমভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য কুদ্দুস শেখের বাড়িতে প্রবেশ করে দেখা যায়, তার দুটি ভবনই সম্পূর্ণভাবে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ঘরের প্রায় প্রতিটি কক্ষের আসবাবপত্র তছনছ করা হয়েছে। আলমারি, খাট, ড্রেসিং টেবিল, ফ্রিজ ও টেলিভিশনসহ সমস্ত গৃহস্থালির জিনিসপত্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঘরের দরজা ও জানালা পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার পাশেই ছেলে হুসাইন শেখের দোতলা ভবনের ছাদে শাবল দিয়ে একাধিক বড় বড় গর্ত করা হয়েছে। অনেক কক্ষের দেওয়ালও ভেঙে ফেলা হয়েছে।
স্থানীয়দের বিবরণ অনুযায়ী, হামলাকারীরা প্রথমে সংঘবদ্ধ হয়ে বাড়িগুলো থেকে সমস্ত মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় পুনরায় এসে শাবল, হাতুড়ি ও লোহার রড দিয়ে বাড়িগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ভাঙচুর করে। অনেক বসতবাড়ির টিনের চাল, দরজা, জানালার গ্রিল, কাঠামোর বিভিন্ন অংশ এবং দেয়ালের বৈদ্যুতিক তার পর্যন্ত উপড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কুদ্দুস শেখের পাশাপাশি হুসাইন শেখ, উকিল শেখ, এনায়েত শেখ, জনি শেখ, আলিম শেখ, শাহাদাৎ শেখ, আজগর শেখ, উজ্জ্বল শেখ ও রকিব শেখের বাড়িতেও একই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে রয়েছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বড়ভাগ গ্রামের এই দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুরনো বিরোধ চলে আসছিল। সাবেক ইউপি সদস্য কুদ্দুস শেখের ছেলে হুসাইন শেখ এবং একই গ্রামের মুরাদ খানের মধ্যে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। এর আগে বিগত দিনেও বিরোধের জেরে হুসাইন শেখের ডান হাতের কব্জি কেটে নেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটেছিল, যে মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। সর্বশেষ গত ১৯ জুন হুসাইন শেখের সমর্থক আলিম শেখ ও তার ছেলে হামলার শিকার হন এবং এর ঠিক এক সপ্তাহ পর ২৬ জুন সন্ধ্যায় কলেজছাত্র সুমন শেখকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের ভাই শামীম শেখ বাদী হয়ে ১৭ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পুলিশ কেবল এজাহারভুক্ত মাত্র একজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।
মামলার বাদী শামীম শেখ দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের ২১ দিন পার হয়ে গেলেও মূল আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে এবং তারা প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের এই ঘটনার সঙ্গে তাদের পক্ষের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই বলে তিনি দাবি করেছেন।
টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান জানান, এলাকার স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। সেই পুরনো বিরোধের ধারাবাহিকতায় পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের জেরে শেষ পর্যন্ত সুমন শেখের মতো তরুণের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
এদিকে আলফাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফকির ফাইজুর রহমান এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন।
ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রైম অ্যান্ড অপস) মো. শামসুল আজম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত একজনকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনতে জোরদার অভিযান চলছে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি পুলিশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে তিনি জানান। তবে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো পৃথক মামলা দায়ের হয়নি, অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। উল্লেখ্য, চাঞ্চল্যকর সুমন শেখ হত্যা মামলার মূল তদন্তভার ইতোমধ্যে আলফাডাঙ্গা থানা থেকে সরিয়ে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন