উজানের অতিরিক্ত পানি বৃদ্ধি এবং মেঘনা নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারের তীব্র স্রোতে ভোলার দৌলতখান উপজেলায় প্রায় দুই শতাধিক মহিষ ও গবাদিপশু ভেসে যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে আকস্মিক এই বন্যায় তলিয়ে গেছে স্থানীয় খামারিদের গোয়ালঘর, বসতঘর এবং ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও ভেসে যাওয়া মহিষগুলোর কোনো সন্ধান পাননি মালিকরা। একদিকে বিশাল অঙ্কের গবাদিপশু হারানোর তীব্র আশঙ্কা এবং অন্যদিকে নদী ডাকাতের আতঙ্কে চরম উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত খামারিরা।
গত শুক্রবার (১৭ জুলাই) রাতের হঠাৎ অস্বাভাবিক জোয়ারের তোড়ে উপজেলার মেঘনা নদীর মাঝের চর বৈরাগী, মেদুয়া, মদনপুর, চর হাজারী ও হাজীপুরসহ বেশ কয়েকটি সংবেদনশীল চরাঞ্চল প্লাবিত হয়। এই আকস্মিক প্লাবনে চরের মহিষগুলো ভেসে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত মহিষের মালিকদের মধ্যে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও খামারিরা রয়েছেন। খামারিদের ভাষ্যমতে, ভেসে যাওয়া মহিষগুলোর সন্ধানে তারা আশেপাশের বিভিন্ন চরে জোরদার অনুসন্ধান চালালেও এখন পর্যন্ত কোনো সন্ধান মেলেনি। ১৭ জুলাই রাতে অস্বাভাবিক জোয়ারের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় রাখালদের তৈরি করা উঁচু আশ্রয়স্থল বা ‘কিল্লা’ পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে মহিষের বাতান থেকে প্রায় দুই শতাধিক মহিষ প্রবল স্রোতের টানে অন্যত্র ভেসে চলে যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের দাবি, শুধু মহিষ ভেসে যাওয়া নয়, বরং গোয়ালঘর ধ্বংস হওয়া, প্রয়োজনীয় ঔষধি সামগ্রী ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাদের প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা খামারি জাকির হোসেন বাবুল জানিয়েছেন, হারিয়ে যাওয়া মহিষগুলো দ্রুত উদ্ধার করতে এবং খামারিদের এই বিপদে রক্ষা করতে অবিলম্বে প্রশাসনের কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, উজানের পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় দৌলতখান উপজেলার মূল বেড়িবাঁধের বাইরের নিচু এলাকার চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এর ফলে ভবানীপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড এবং সৈয়দপুর ইউনিয়নের ৬, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি ঘরে ঢুকে পড়ায় বাধ্য হয়ে তারা ঘরের ভেতরে উঁচু করে কাঠের মাচা তৈরি করে বসবাস করছেন। বসতঘরের চুলা পানিতে সম্পূর্ণ তলিয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়া এসব মানুষের তিন বেলা ঠিকমতো রান্না করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বন্যার শিকার অসহায় এসব মানুষ অভিযোগ করেছেন যে, দুর্দিনেও এখন পর্যন্ত কোনো সাহায্য বা খোঁজ নিতে কেউ তাদের এলাকায় আসেননি। স্থানীয় বাসিন্দা ছাদেক, আশরাফুল, মাইন উদ্দিন ও আবুল কাশেমের মতো দিনমজুররা জানান, খেটে খাওয়া মানুষ হিসেবে প্রতিদিনের কাজ করতে পারলে তবেই তাদের চুলায় ভাত ফোটে, অন্যথায় না খেয়ে উপোস থাকতে হয়। বর্তমানে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে রাতে শুধু চিড়া-মুড়ি কিংবা শুকনো রুটি খেয়ে দিন পার করছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যাভাবের কারণে চরম অনাহার ও অর্ধাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছে পানিবন্দি এসব এলাকার শত শত মানুষ।
মন্তব্য করুন