ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এফডিসি-পলাশী সংযোগ সড়কের নতুন র্যাম্প নির্মাণের ফলে হাতিরঝিল জলাধার ও পান্থকুঞ্জ পার্কের পরিবেশ ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়বে বলে তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও নগর–পরিকল্পনাবিদেরা। রাজধানীর বাংলামোটরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। আরবান স্টাডিজ ফাউন্ডেশন, বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শহরের উন্নয়ন কেবল মানুষের যান্ত্রিক সুবিধার কথা ভেবে করা হলে তা প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে না, কারণ প্রকৃতি ধ্বংস করে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা অসম্ভব। ‘বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন’-এর সমন্বয়ক আমিরুল রাজিব ও নাঈম উল হাসান মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে, আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী পান্থকুঞ্জ পার্কের আশপাশে কোনো ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। কিন্তু বিগত সরকারের পাশাপাশি পরবর্তী প্রশাসনের আমলেও এই বিধিমালার তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। অপরিকল্পিত এই প্রকল্পের কারণে পান্থকুঞ্জ ও হাতিরঝিল এলাকার যে সংখ্যক গাছ কাটা হয়েছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকাকে মানুষের বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী করে তুলবে।
পান্থকুঞ্জ পার্ক অংশের বিতর্কিত এই র্যাম্প অবিলম্বে বাতিলের জোরালো দাবি জানিয়ে বিআইপি সভাপতি ও নগর–পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পান্থকুঞ্জ পার্ক, হাতিরঝিল জলাধার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার পরিবেশ ও যান চলাচল মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়বে। এর মূল সুবিধাভোগী হবে কেবল ব্যক্তিগত মোটরগাড়ি ব্যবহারকারী একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা আন্দোলন করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর সাড়া না মেলায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জনগণের তীব্র প্রতিবাদের মুখে অবিলম্বে এই র্যাম্প নির্মাণ বন্ধ করতে হবে এবং পূর্বের সরকারের আমলে এই প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম বা আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দেখতে হবে।
ঘনবসতিপূর্ণ কাঁঠালবাগান এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা সাদমান সাকিব জানান, ভূমিকম্পের মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এলাকায় সাধারণ মানুষের আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো খোলা মাঠ বা ফাঁকা জায়গা নেই, একমাত্র ভরসা ছিল এই ‘পান্থকুঞ্জ পার্ক’। কিন্তু অপরিকল্পিত এই এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কারণে সেই পার্কটিও আজ বেদখল হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম উৎকণ্ঠা ও বিপাকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আকতার মাহমুদ মন্তব্য করেন যে, অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার কারণে ঢাকা শহর ইতিমধ্যেই এক ভয়াবহ জনদুর্ভোগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার পার্ক ও বহুমুখী জলাভূমিগুলো সুনির্দিষ্টভাবে সংরক্ষণের জন্য ‘পার্ক অ্যান্ড রিক্রিয়েশন অথরিটি’ নামে একটি স্বাধীন পৃথক সংস্থা গঠনের ওপর তিনি জোর দেন।
বিআইপির সহসভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বর্তমান সরকারের সবুজ ও পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়ার রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, রাজউক বা সিটি করপোরেশনের মতো যেসব প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনায় ঢাকা আজ বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকার শীর্ষে পৌঁছেছে, তাদের একই কাঠামোতে রেখে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা অসম্ভব। বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসানের সঞ্চালনায় উক্ত গোলটেবিল আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন বুয়েটের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, পরিকল্পনাবিদ খন্দকার নিয়াজ রহমান, লেখক ও রাজনৈতিক সংগঠক ফিরোজ আহমেদ, আন্তর্জাতিক কিউরেটর নিক্লাওস গ্রেবার এবং সাংবাদিক মতিন আবদুল্লাহ প্রমুখ।
মন্তব্য করুন