রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক যাত্রার শুরু থেকেই একটি অভিযোগ বারবার ঘুরেফিরে আসছে—তিনি কংগ্রেসের অভিজ্ঞ ও প্রথাগত নেতা-কর্মীদের চেয়ে বাইরের পেশাদার বা নতুনদের সঙ্গেই কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। রাজনীতিতে ‘আউটসাইডার’ বলতে এখানে কেবল নবাগতদের বোঝানো হচ্ছে না, বরং এমন একদল মানুষকে বোঝানো হচ্ছে যারা জেলা কমিটি, যুব কংগ্রেস কিংবা প্রদেশ কংগ্রেসের চেনা পথ মাড়িয়ে আসেননি। প্রযুক্তিবিদ, আমলা, অ্যাক্টিভিস্ট বা ব্যক্তিগত সহকারীদের নিয়ে গড়া এই বলয়টিই এখন রাহুলের মূল ভরসার জায়গা, যা দলের পুরনো নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি করেছে গভীর ক্ষোভ ও দূরত্ব।
রাহুলের এই আউটসাইডার প্রীতির সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হলো আম আদমি পার্টির সাবেক নেতা রাজেন্দ্র পাল গৌতমের উত্তরপ্রদেশের ‘এআইসিসি ইনচার্জ’ হিসেবে নিয়োগ। যেখানে উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেসের ইতিহাস ও আবেগের সাথে জড়িয়ে আছে, সেখানে একজন নবাগতকে এমন গুরুদায়িত্ব দেওয়া অনেক হেভিওয়েট নেতার কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। রাহুল গান্ধী স্পষ্ট বার্তাই দিচ্ছেন যে, তিনি কংগ্রেসের পুরনো কাঠামোর উত্তরাধিকারের চেয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজস্ব বিশ্বাসযোগ্য নতুন মুখদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। শশীকান্ত সেন্থিল থেকে শুরু করে প্রবীণ চক্রবর্তী বা কে রাজুর মতো ব্যক্তিরা রাহুলের এই ‘কোটারি’ বা আধুনিক বলয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন।
তবে কংগ্রেসের আজীবন একনিষ্ঠ কর্মীদের মতে, সমস্যাটি কেবল বাইরের মানুষের অন্তর্ভুক্তি নয়, বরং ঘরের মানুষদের মূল্যায়ন না করার ব্যর্থতা। যারা মোদির উত্থানের কঠিন দিনগুলোতে ইডি-সিবিআইয়ের চাপ আর লাগাতার পরাজয় সহ্য করেও দল ছেড়ে যাননি, তারা আজ পদ বণ্টনের সময় নিজেদের অপাংক্তেয় মনে করছেন। রাহুলের এই কৌশলের পেছনের মূল কারণ সম্ভবত পুরনো কংগ্রেসের সুবিধাবাদী সংস্কৃতি এবং কোন্দলের প্রতি তার অনীহা। তিনি চান এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে তার উপদেষ্টা বা অনুগতরা কেবল তার কাছেই দায়বদ্ধ থাকবেন, দলের পুরনো প্রাদেশিক নেতাদের কাছে নয়।
অথচ বাস্তব রাজনীতি কেবল কৌশলপত্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি হলো সবাইকে এক সুতোয় বাঁধার শিল্প। বাইরের পেশাদাররা হয়তো চমৎকার স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে পারেন, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বুথ নেটওয়ার্ক বা ব্লক কমিটির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এখানেই রাহুলের স্ববিরোধিতা একজন রাহুল গান্ধী দলিত প্রতিনিধিত্ব ও বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেন, অন্য রাহুল এমন একটি বলয় পরিচালনা করেন যেখানে তার কাছে পৌঁছানোর পথটি অত্যন্ত সীমিত। এই স্ববিরোধিতা দলের সাধারণ কর্মীদের মনে এক গভীর হীনম্মন্যতা ও বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
একজন বিশ্বস্ত কর্মী যখন দেখেন যে, রণকৌশল নির্ধারণের সময় তাকে অদৃশ্য রাখা হচ্ছে এবং পুরস্কারের মঞ্চে অচেনা মুখগুলো স্থান পাচ্ছে, তখন দলের প্রতি তাদের আবেগ ধসে পড়াটাই স্বাভাবিক। রাহুল হয়তো তার এই ‘আউটসাইডার রিপাবলিক’ দিয়ে নতুন কোনো কংগ্রেস গঠনের স্বপ্ন দেখছেন, কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল কেবল পেশাদার উপদেষ্টা দিয়ে পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। দল পুনর্গঠনে যেমন বাইরের দক্ষতার প্রয়োজন, তেমনি দলের ইতিহাস বয়ে বেড়ানো ঘরের মানুষেরও সমান প্রয়োজন। দলের ভেতরে জমে থাকা এই ক্ষোভ যদি প্রশমিত না হয়, তবে রাহুলের এই সংস্কার প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
আপনার কি মনে হয়, রাহুল গান্ধীর এই 'পেশাদার বা আউটসাইডার' কেন্দ্রিক রাজনীতি কংগ্রেসকে ভবিষ্যতে সাফল্যের পথে নিয়ে যাবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় কোনো সংকটের দিকে ঠেলে দেবে?
মন্তব্য করুন