স্বাগতিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের যাত্রা এবার এক ভিন্ন ও ঐতিহাসিক রূপ নিয়েছে। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আগামী বৃহস্পতিবার সোফাই স্টেডিয়ামে তুরস্কের মুখোমুখি হওয়ার আগেই নকআউট পর্ব (রাউন্ড অব থার্টি-টু) নিশ্চিত করে ফেলেছে মাউরিসিও পচেত্তিনোর দল। গত শুক্রবার রাতে তুরস্কের বিপক্ষে প্যারাগুয়ের ১-০ গোলের জয়ের সুবাদে গ্রুপ ‘ডি’-এর শীর্ষস্থানও নিশ্চিত হয়ে গেছে আমেরিকার। অতীতের বিশ্বকাপগুলোতে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত চরম স্নায়ুচাপ ও নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে যাওয়া ইউএসএমএনটি (USMNT) এবার প্রথম দুই ম্যাচেই নিজেদের শক্তিমত্তা ও ধারাবাহিকতা প্রদর্শন করে সমীকরণ সহজ করে নিয়েছে।
এবারের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দলটিতে এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ও আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছে। দলের ৩৮ বছর বয়সী অভিজ্ঞ অধিনায়ক টিম রিম জানান যে, এবারের দলটির আবহ সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং খেলোয়াড়দের মধ্যকার বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়। অতীতে মার্কিন ফুটবল কেবল কষ্টার্জিত ফলাফলের জন্য পরিচিত হলেও, এবার পচেত্তিনোর অধীনে তারা আক্রমণভাগে নান্দনিকতা এবং রক্ষণে দৃঢ়তার এক দারুণ ভারসাম্য ফুটিয়ে তুলছে।
বিশেষ করে দলের প্রধান তারকা ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিকের অনুপস্থিতিও টের পেতে দেয়নি এই দল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে কোচ পচেত্তিনো যখন জানান যে চোটের কারণে পুলিসিক খেলবেন না, তখন সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পচেত্তিনো উইঙ্গার খেলানোর প্রথাগত চিন্তা থেকে বেরিয়ে রিকার্ডো পেপিকে দ্বিতীয় স্ট্রাইকার হিসেবে নামিয়ে এক দারুণ চাল চালেন। পেপি ও ফোলারিন বালোগুনের যুগলবন্দী অস্ট্রেলিয়ার রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রাখে এবং পুলিসিককে ছাড়াই চাপের ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়ে আমেরিকা। পুলিসিক বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার আর্ভিনে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন এবং পুরোপুরি ফিট না হলে তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচেও পচেত্তিনো তাকে নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেবেন না।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় গোলটির ক্ষেত্রে মালিক টিলম্যানের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। প্রান্তসীমার কাছাকাছি ডিফেন্ডারদের বাধা সত্ত্বেও বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে তিনি একটি ফাউল আদায় করেন। সেই ফ্রি-কিক থেকে অ্যান্টোনি রবিনসন হয়ে সার্জিনো ডেস্টের শট ডিফ্লেক্টেড হলে তা থেকে চমৎকার হেডে গোল করেন অ্যালেক্স ফ্রিম্যান। রক্ষণ ও আক্রমণের মাঝে টিলম্যানের এই সংযোগ পুরো টুর্নামেন্টে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় শক্তির জায়গা হয়ে উঠেছে।
তবে টানা দুই ম্যাচে মাত্র ১টি গোল হজম করলেও যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণভাগ এখনো পুরোপুরি নিটোল নয়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের শেষভাগে অজিদের একের পর এক আক্রমণ সামলাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল মার্কিন ডিফেন্ডারদের। বড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই ধরনের রক্ষণাত্মক দুর্বলতা বড় বিপদের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সিয়াটেলের লুমেন ফিল্ডে উপস্থিত দর্শকদের ফুটবল উন্মাদনা আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত কোচ পচেত্তিনোকেও আবেগপ্রবণ করে তুলেছে। গ্যালারির এই শক্তি দলের ভেতর এক অন্যরকম অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ম্যাচ শেষে নকআউট নিশ্চিতের আনন্দে মাঝমাঠে বৃত্ত তৈরি করার সময় অধিনায়ক টিম রিম চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
টানা দুই ম্যাচ জয়ের এই কীর্তি যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের জন্য গত ৯৬ বছরের মধ্যে প্রথম। তবে এই জয়েই আত্মতুষ্টিতে ভুগতে নারাজ দল। মিডফিল্ডার টাইলার অ্যাডামস সতীর্থদের পা মাটিতে রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই উদযাপনের আবহ থেকে বেরিয়ে আবার কাজে ফিরতে হবে। কারণ ২০০২ সালের পর থেকে তারা বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছাতে পারেনি, তাই এবারের মূল লক্ষ্য আরও অনেক দূরে।
মন্তব্য করুন