|
দ্রুত লিংক
বিভাগসমূহ
মিডিয়া বিভাগ
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : Jun 10, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

পুলিশের ওপর হামলা ও সার্বভৌমত্বের সংকট

ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি হলো তার সার্বভৌমত্ব, যা ছাড়া কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা অসম্ভব। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় সার্বভৌমত্ব হলো এমন এক সর্বোচ্চ ও একচ্ছত্র ক্ষমতা, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার ভৌগোলিক সীমানার অভ্যন্তরে সব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও নীতিকে আইনগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। এই সার্বভৌমত্ব মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ থেকে দেশকে মুক্ত রাখাই বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব, আর দেশের অভ্যন্তরে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও আইন কার্যকর করার একচ্ছত্র দেওয়ানি ক্ষমতা হলো অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব। বাস্তব জীবনে এই অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান, প্রায়োগিক এবং প্রথম প্রতীক হলো দেশের পুলিশ বাহিনী। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের বিখ্যাত সংজ্ঞা অনুযায়ী, "রাষ্ট্র হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার (Monopoly of Legitimate Violence) রাখে।" রাষ্ট্র তার এই বৈধ বলপ্রয়োগের ক্ষমতা প্রয়োগ করে মূলত পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে, যেমন কুমিল্লায় হাইওয়ে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর কিংবা রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের সামনে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে মারধরের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং এগুলো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের কাঠামোর ওপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে সরাসরি অস্বীকার করার একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। যখন কোনো সমাজে বা রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর এভাবে প্রকাশ্য ও সংগঠিত আক্রমণ চলতে থাকে, তখন তা কেবল আইনশৃঙ্খলার স্বাভাবিক অবনতি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা সমাজে একটি মারাত্মক ‘আইন না মানার সংস্কৃতি’ বা 'মব কালচার' (Mob Culture) তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অকার্যকর ও ভঙ্গুর করে তোলে।

রাষ্ট্রের আইন বাস্তবায়নকারী প্রতিনিধি এবং নিরস্ত্র সরকারি কর্মচারীদের ওপর এই ধরণের ধারাবাহিক ও সমষ্টিগত সহিংসতার ৪টি প্রধান ক্ষতিকর দিক নিচে দেওয়া হলো:

  • ১. রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের অবক্ষয় ও মব কালচারের উত্থান: যখন সমাজে কোনো সুনির্দিষ্ট দাবি আদায়ের নামে বা পরিস্থিতিগত উত্তেজনায় সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন 'মব কালচার' শক্তিশালী হয়। এর ফলে সমাজে এই ভুল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, শক্তি বা জনসমাগমই আইন এবং রাষ্ট্রীয় আইন কেবল আনুষ্ঠানিকতা।

  • ২. নিরস্ত্র সরকারি কর্মচারীদের নিরাপত্তাহীনতা: রাষ্ট্র যদি তার প্রথম সারির দৃশ্যমান ও নিরস্ত্র প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে ভূমি অফিস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রশাসন, স্থানীয় সরকারি দপ্তরসহ অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, যা সামগ্রিক প্রশাসনিক স্থবিরতা ডেকে আনে।

  • ৩. পুলিশের মনোবল হ্রাস ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি: পুলিশ সদস্যরা যদি পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে বারবার উগ্র জনতার আক্রমণের শিকার হন এবং রাষ্ট্র যদি তাদের আইনি ও শারীরিক নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে। ফলস্বরূপ, অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং সাধারণ নাগরিকদের জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়ে।

  • ৪. আইনের শাসনের প্রতি জনআস্থার সংকট: আইন কেবল বই বা নথিতে থাকলে তা কার্যকর হয় না; তার জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির নিরবচ্ছিন্ন প্রয়োগ। পুলিশ আক্রান্ত হলে বা রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হলে আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ দ্রুত হ্রাস পায়, যা সমাজকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেয়।

    একটি আধুনিক ও আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা মূলত তিনটি অপরিহার্য স্তম্ভের ওপর নির্ভর কর  আইন (কাঠামো), বলপ্রয়োগ (বাস্তবায়নের মাধ্যম) এবং জনসমর্থন (সামাজিক ভিত্তি)। এই তিনটি স্তম্ভের যেকোনো একটি দুর্বল হলে পুরো রাষ্ট্রীয় ইমারত ভেঙে পড়তে পারে। তবে একই সাথে এটাও রাষ্ট্রনৈতিক সত্য যে, রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের ক্ষমতা কখনোই সীমাহীন বা স্বৈরাচারী হতে পারে না। এই ক্ষমতাকে অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং মানবাধিকারের সীমারেখার মধ্যে থেকে প্রয়োগ করতে হবে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় শক্তির কার্যকারিতা এবং মানবাধিকারের সুরক্ষার মধ্যে একটি সুচারু ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

    বর্তমান বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও গতিশীলতা বজায় রাখতে হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কিংবা যেকোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে। এই ধরণের অপরাধের সাথে জড়িতদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে কোনো ব্যক্তি বা সাময়িক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের ইচ্ছামতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকল্প বা 'মব জাস্টিস'-এর চালক হয়ে উঠতে না পারে। রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সাধারণ নাগরিক— সব পক্ষেরই সম্মিলিত দায়িত্ব হলো আইনের শাসনকে শ্রদ্ধা করা এবং সহিংসতার পরিবর্তে জবাবদিহিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিকে সহযোগিতা করা, তবেই একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী রাষ্ট্র বিনির্মাণ সম্ভব।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যুক্তরাষ্ট্রের ৩০০ মিলিয়ন ডলারের রাডার ধ্বংস করল ইরান

1

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে এনসিপির ফল উৎসবে হামলা ও প্যান্ডেল ভাঙ

2

বিশ্বে প্রতি ৭০ জনের একজন বাস্তুচ্যুত, তথ্য জাতিসংঘের

3

বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ছিলেন লন্ডন ষড়যন্ত্রের

4

আবারও ভারতের শীর্ষ ধনী তারকা শাহরুখ খান

5

ওয়ার্নার ব্রাদার্স কেনার দৌড় থেকে সরে দাঁড়াল নেটফ্লিক্স

6

ইরান দলকে ম্যাচ খেলেই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে!

7

খামেনির বিদায় অনুষ্ঠান স্থগিত: অভাবনীয় জনসমাগমের শঙ্কায় ন

8

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল: সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ

9

জুলাই সংস্কার অধ্যাদেশ ও গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ: হাইকোর্টের

10

টালিউডে ব্যান কালচার নিয়ে দেবের আল্টিমেটাম: মুখ খুললেন প্রসে

11

আবাসন খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ

12

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় ঘোষণা রোববার

13

ইরান হয়ে পাকিস্তানের প্রথম স্থলপথ রপ্তানি শুরু: নতুন বাণিজ্য

14

বাঙালি কত প্রকার? সমাজ ও ভণ্ডামির ব্যবচ্ছেদ

15

স্থানীয় ভোটে পোস্টার নিষিদ্ধ, এআই প্রচারণায় কড়াকড়ি

16

তিন লাল কার্ডের ম্যাচে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক জয়

17

অর্জুন কাপুরের পর এবার ছোট পর্দার সোরাব বেদী? ভাইরাল ভিডিওতে

18

আইপিএল ২০২৬ থেকে ছিটকে গেলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি, বড় ধাক্কা খে

19

আজকের খেলার সূচি ৩০ মার্চ ২০২৬ | আইপিএল ও আন্তর্জাতিক ফুটবল

20