রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সিলেট বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরে আসার প্রত্যাশা তৈরি হলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উপদলীয় কোন্দল ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর অনুসারীরা দুটি আলাদা বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ায় ঐতিহ্যবাহী এই দলটিতে নতুন করে বিভক্তির ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে। অতীতে এই জেলায় অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ছাত্রদলনেতা মুন্নাসহ একাধিক নেতাকর্মীর প্রাণহানির ইতিহাস থাকলেও বর্তমান নেতৃত্ব সেই অতীত থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে করছেন দলের ত্যাগী নেতারা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই সিলেটে পাথর কোয়ারী দখল, বাস টার্মিনাল ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। পরবর্তীতে গোয়াইনঘাট উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বহিষ্কার এবং মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে কেন্দ্র ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মে মাসে পলাতক মেয়রের ফোনকলকে কেন্দ্র করে শীর্ষ নেতাদের পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন এবং পরবর্তীতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকীর সভায় আরিফুল হক চৌধুরী ও কয়েস লোদীর প্রকাশ্য বাগবিতণ্ডার মধ্য দিয়ে এই দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়। এছাড়া বিশ্বনাথ পৌর শহরে দলের দুই কেন্দ্রীয় উপদেষ্টার অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক মনোনয়ন জটিলতা এই কোন্দলকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নিজ বাড়িতে মহানগর বিএনপির কার্যালয় উদ্বোধনের সময় বিভক্তির বিষয়টি চরম রূপ নেয়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের উদ্যোগে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী এবং জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীসহ একাধিক শীর্ষ নেতাকে আমন্ত্রণ না জানানোর অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়েস লোদী জানান, দলের দুর্দিনে নেতৃত্ব দিয়েও ন্যূনতম দাওয়াতটুকু না পাওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। অন্যদিকে আমন্ত্রণ না পাওয়ার বিষয়ে জেলা সভাপতি ব্যস্ততার কথা জানালেও আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ওয়ার্ড পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের পাশাপাশি এটি মূলত সাধারণ আমন্ত্রণ ছিল।
সিলেট বিএনপিতে এই গ্রুপিংয়ের ইতিহাস প্রায় চার দশকের পুরোনো। একসময়ের খন্দকার আব্দুল মালিক ও এম সাইফুর রহমানের মধ্যকার বলয় থেকে শুরু করে পরবর্তীতে এম ইলিয়াস আলী এবং আরিফুল হকের হাত ধরে এই ধারা চলমান ছিল। বর্তমানে সিলেট-১ আসনে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং সিলেট-৪ আসনে আরিফুল হক চৌধুরী দুজনেই মন্ত্রী হওয়ার পর তাদের অনুসারীদের ক্ষমতার লড়াইয়ে স্থানীয় রাজনীতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দলের প্রবীণ ও ত্যাগী নেতারা মনে করছেন, সময়মতো এই অনৈক্য ও গ্রুপিংয়ের লাগাম টেনে না ধরলে সিলেট বিএনপিকে আবারও পুরোনো সেই ধ্বংসাত্মক ‘ঘোড়ারোগে’ গ্রাস করতে পারে।
মন্তব্য করুন