লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির ঠিক পশ্চিম অংশে অবস্থিত দেশটির সবচেয়ে বড় এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাওয়িয়া তেল শোধনাগারে পরপর ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে সেখানে বর্তমানে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশের জরুরি সেবা সংস্থাগুলোর কর্মীরা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন। গত দুই দিনের ধারাবাহিকতায় শোধনাগারটিতে ঘটা এটি তৃতীয় কোনো হামলার ঘটনা বলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে। গত সোমবার (১০ আগস্ট) সন্ধ্যার ঠিক প্রাক্কালে শোধনাগার চত্বর লক্ষ্য করে এই ড্রোন হামলা চালানো হয়। লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন (এনওসি) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, এবারের হামলায় প্রায় ৪৫ লাখ লিটার জ্বালানি ধারণ করার বিশাল ক্ষমতাসম্পন্ন একটি মূল ট্যাংকে সরাসরি ড্রোন দিয়ে আঘাত করা হয়। এই নিখুঁত ও মারাত্মক আঘাতের ফলেই ট্যাংকটিতে মুহূর্তেই আগুন ধরে যায় এবং তীব্র উত্তাপে একপর্যায়ে সেটি সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। চলমান এই ভয়াবহ হামলা যদি এভাবে অব্যাহত থাকে, তবে দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জাওয়িয়া শোধনাগারটির সমস্ত কার্যক্রম সাময়িকভাবে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও এনওসি-র পক্ষ থেকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
লিবিয়ার অ্যাম্বুলেন্স অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সার্ভিস মঙ্গলবারের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যে জানিয়েছে যে, আকস্মিক এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো প্রাণহানি বা গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে শোধনাগার এলাকার আশপাশে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভোগা বেশ কিছু স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মীকে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। উল্লেখ্য, জাওয়িয়া শোধনাগারটি বর্তমানে লিবিয়ার সবচেয়ে বড় এবং সচল থাকা তেল শোধনাগারগুলোর মধ্যে অন্যতম, যার প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল পেট্রোলিয়াম ও অন্যান্য জ্বালানি তেল পরিশোধনের সুনির্দিষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। এনওসি আরও জানিয়েছে যে, বিগত কয়েক দিনের ব্যবধানে জাওয়িয়ার এই কৌশলগত স্থাপনাটিতে একই ধরনের আরও বেশ কিছু হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত কয়েক দিনে একটি ন্যাফথা সংরক্ষণাগার এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রেও পৃথক দুটি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল। বারবার ঘটে চলা এসব অন্তর্ঘাতমূলক হামলার পেছনে ঠিক কোন কুচক্রী মহল বা শক্তি জড়িত রয়েছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে বের করার জন্য সংশ্লিষ্ট আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটি।
লিবিয়ার বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় ঘটে চলা এই ধারাবাহিক হামলার ঘটনাগুলো দেশটিতে দীর্ঘ সময় ধরে চলমান তীব্র রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিতিশীলতার চিত্রটিকে আবারও আন্তর্জাতিক মহলের সামনে অত্যন্ত স্পষ্ট করে তুলেছে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে অর্থাৎ ১৯৬৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করার পর প্রায় চার দশক ধরে লিবিয়া এককভাবে শাসন করেছিলেন স্বৈরশাসক কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি। কিন্তু পরবর্তীতে ২০১১ সালে পশ্চিমা সামরিক জোটের সরাসরি হস্তায়নে গড়ে ওঠা এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মুখে তিনি চূড়ান্তভাবে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং পরবর্তীতে নির্মমভাবে নিহত হন। কর্নেল গাদ্দাফির পতনের পর থেকে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও লিবিয়া রাজনৈতিকভাবে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি; বরং দেশটি কার্যত দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ও যুদ্ধরত ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। গাদ্দাফির উত্তরসূরিবিহীন এই বিভক্ত রাষ্ট্রে বর্তমানে পূর্বাঞ্চলীয় শাসনক্ষমতার অংশীদার হিসেবে শক্তিশালী সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতার তার প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। অন্যদিকে দেশের রাজধানী ত্রিপোলিভিত্তিক পশ্চিমাঞ্চলের বৈধ সরকার পরিচালনা করছেন প্রধানমন্ত্রী আবদুলহামিদ দবেইবাহ, যার ফলে দুই পক্ষের ক্ষমতার এই তীব্র দ্বন্দ্ব লিবিয়াকে প্রতিনিয়ত গভীর সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মন্তব্য করুন