রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে শত শত কামিকাজি ড্রোন তৈরির প্রয়োজনীয় কার্বন ফাইবার কাঁচামাল গোপনে সরবরাহ করেছে চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ ও পলিটিকো-এর যৌথ এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ শিপিং, কাস্টমস ও চুক্তিভিত্তিক নথি পর্যালোচনা করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান জিলিন কেমিক্যাল ফাইবার গ্রুপ রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪৬ টন কার্বন ফাইবার তৈরির কাঁচামাল পাঠিয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং পণ্যটির প্রকৃত পরিচয় ও সামরিক ব্যবহার আড়াল করতে সাধারণ সিনথেটিক ফাইবারের জন্য ব্যবহৃত কাস্টমস কোড ব্যবহার করা হয়েছিল। এই চীনা উপকরণ গ্রহণকারী রুশ প্রতিষ্ঠানটি তাতারস্তানের আলাবুগা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত, যা ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত রাশিয়ার দীর্ঘপাল্লার ‘গেরান’ কামিকাজি ড্রোনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ উৎপাদনে সরাসরি যুক্ত। পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার তালিকাতেও এই রুশ প্রতিষ্ঠানটির নাম রয়েছে।
ইউক্রেনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইউক্রেনিয়ান সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন সেন্টার (ইউএসসিসি) জানিয়েছে, ২০২২ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত একই ধরনের কাঁচামাল সরবরাহের অন্তত আটটি বড় দরপত্র ও চালান আসার তথ্য তাদের হাতে এসেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, চীনা প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহ করা এই উপকরণ দিয়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কামিকাজি ড্রোনের ফ্রেম ও কাঠামো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কার্বন ফাইবার উৎপাদন করা সম্ভব। মার্কিন ও ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নথিগুলো নিবিড়ভাবে যাচাই করে সেগুলোকে সম্পূর্ণ প্রামাণিক বলে নিশ্চিত করেছেন। মার্কিন অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনা সরকারের জ্ঞাতসার বা নীরব সম্মতি ছাড়া এত বড় পরিসরে ও নিয়মিতভাবে সামরিক গুরুত্বসম্পন্ন উপকরণের চালান পাঠানো অসম্ভব।
এদিকে রাশিয়ার রোসাটম কর্তৃপক্ষ বরাবরই এই ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস দাবি করেছে, চীন ইউক্রেন সংঘাতে কোনো পক্ষকেই প্রাণঘাতী অস্ত্র সরবরাহ করে না এবং দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য (ডুয়েল-ইউজ) পণ্যের রপ্তানির ওপর তাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। তবে মার্কিন ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পকে সচল রাখতে চীনের এ ধরনের দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্যের সরবরাহ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা মস্কোর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অব্যাহত রাখতে মুখ্য ভূমিকা রাখছে। এই নতুন তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর রাশিয়া ও চীনের কৌশলগত সম্পর্ক এবং ইউক্রেন সংকটে বেইজিংয়ের ভূমিকা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে কূটনৈতিক চাপ আরও তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
মন্তব্য করুন