শ্রীকৃষ্ণপ্রেম সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ, পবিত্র ও আধ্যাত্মিক। লৌকিক প্রেমের ঊর্ধ্বে জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের প্রতীক এই প্রেমের কোনো ভেদাভেদ নেই; রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র কিংবা জ্ঞানী-অজ্ঞানী কারও মাঝে পার্থক্য না করে তিনি ভালোবেসেছেন তাঁর ভক্তকে। অশান্ত ও চঞ্চল চিত্তের অর্জুনকে সখা ও ভক্ত হিসেবে উদ্দেশ করে তিনি জগৎবাসীকে জ্ঞানহীন অন্ধকারে সুপথে চলার পথনির্দেশক ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’র জ্ঞান দান করেছেন, দেখিয়েছেন মুক্তি ও মোক্ষ লাভের পথ। গীতায় (৪/৬) শ্রীভগবান বলেছেন, ‘অজেহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানীমীম্বরোহপি সন্।/ প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া।।’ অর্থাৎ আমি জন্মরহিত ও অব্যয় হওয়া সত্ত্বেও এবং সর্বভূতের ঈশ্বর হয়েও আমার অন্তরঙ্গা শক্তিকে আশ্রয় করে যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।
দ্বাপর যুগের শেষ প্রান্তে কংস, শিশুপাল ও জরাসন্ধের মতো অত্যাচারী রাজাদের পাপাচার যখন চরমে পৌঁছায়, তখন ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে দুর্যোগপূর্ণ গভীর নিশিতে কারাগারে দেবকীর কোল আলোকিত করে মর্ত্যধামে আবির্ভূত হন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। মানুষ নিজ কর্মের ফলে এ জগতে জন্ম নিলেও ভগবান আসেন নিজের ইচ্ছায়, মানুষের মঙ্গলে এবং অশান্ত ধরণিতে শান্তি প্রতিষ্ঠায়। গীতায় (৪/৭) বলা হয়েছে ‘যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।/ অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজামহ্যম্।।’ অর্থাৎ যখনই ধর্মের গ্লানি ও অধর্মের উত্থান ঘটে, তখনই তিনি অবতীর্ণ হন। এছাড়া তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে বলা হয়েছে ‘পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।/ ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।’ (গীতা ৪/৮) অর্থাৎ সাধুদের পরিত্রাণ, দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্যই তিনি যুগে যুগে মর্ত্যে আসেন।
শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা মানবজাতিকে সবসময় কর্তব্যের পথে পরিচালিত করে। তাঁর প্রতি প্রেম মানুষকে সত্যের পথ দেখায় এবং ভক্তি প্রদান করে পরম আশ্রয় ও মুক্তি। গীতায় (৪/৯) শ্রীকৃষ্ণ আরও বলেছেন, ‘জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।/ ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন।।’ অর্থাৎ যিনি তাঁর এই দিব্য জন্ম ও কর্মতত্ত্ব জানেন, তাকে আর পুনর্জন্মের চক্রে পড়তে হয় না, তিনি সরাসরি নিত্যধাম লাভ করেন। জন্মাষ্টমীর এই পবিত্র উৎসবে আমরা শ্রীকৃষ্ণের সেই মহান আদর্শকে স্মরণ করি এবং পরম পবিত্রতায় দিনটি উদযাপন করি।
আজকের এই শুভ জন্মাষ্টমীর দিনে আমাদের প্রার্থনা নন্দনন্দন শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ, মনন, চিন্তন ও অধ্যয়নের মাধ্যমে আমাদের হৃদয়ে তাঁর সেই নির্মল প্রেম জাগ্রত হোক। তাঁর আদর্শ ও বাণীর মধ্য দিয়ে আমাদের জীবন সত্য, সুন্দর, প্রেম, ভক্তি ও মানবকল্যাণের পথে পরিচালিত হোক। সকলকে জানাই শুভ জন্মাষ্টমী।
মন্তব্য করুন