নতুন সরকারের অধীনে সবার আগে বাংলাদেশ এই সুদূরপ্রসারী জাতীয়তাবাদী দর্শনকে সামনে রেখেই দেশের ইতিহাসে এক নতুন অর্থনৈতিক রূপরেখা ও প্রথম জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বৃহস্পতিবার দেশের বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বাধীন জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সর্বমোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল ও মেগা বাজেট আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করবেন। তবে এই বিশাল বাজেটকে কেন্দ্র করে দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে নানামুখী সমীকরণ ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা বলছেন যে সরকারের প্রক্ষেপিত জিডিপির বিশাল লক্ষ্যমাত্রা যদি বাস্তবে পূরণ করতে হয় তবে বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই আর এই জন্য আসন্ন বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগবান্ধব নীতি সহায়তা, নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, বিদ্যুতের চড়া দাম কমানো এবং ব্যবসা শুরুর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর মতো বাস্তবমুখী পদক্ষেপ থাকা অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদদের মতে আসন্ন মেগা বাজেটে সরকারের সবচেয়ে বড় ও প্রথম মনোযোগ দেওয়া উচিত বর্তমানের লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর। তাঁরা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন যে দেশের সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে হলে সবার আগে ব্যাংকিং খাতের সুদের হার যৌক্তিকভাবে কমাতে হবে যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেসরকারি খাতের থমকে যাওয়া বিনিয়োগেও বড় ধরনের গতি সঞ্চার করবে। এর পাশাপাশি খোলা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও আমদানি স্বাভাবিক রাখতে পারলে বাজারে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে এবং এর ফলে আকাশচুম্বী দামও সাধারণের নাগালের মধ্যে স্থিতিশীল হতে পারে। একই সাথে দেশের সনাতন কর কাঠামো আমূল সংস্কার করে বাজারে অর্থের সামগ্রিক সরবরাহ বাড়ানোর মতো দূরদর্শী পদক্ষেপ বাজেটে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা অন্যথায় কেবল নিয়মিত করদাতাদের ওপর করের বোঝা বাড়লে তা নতুন দেশি বিদেশি বিনিয়োগকে মারাত্মকভাবে নিরুৎসাহিত করবে।
অর্থ বিভাগের উচ্চপর্যায়ের সূত্র থেকে জানা গেছে বিগত বছরগুলোর নানা সংকটে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্তর অনেকটাই নিচে নেমে গেছে এবং এই মন্দা পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতিকে টেনে তুলতে হলে বাজারে অর্থের জোগান ও তারল্য বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই আর এই টাকা ঢেলে টাকা আনার লক্ষ্য থেকেই সরকার এবার বড় বাজেট দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বিশাল ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের খতিয়ানের মধ্যে বড় অংশ অর্থাৎ প্রায় ৳৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকাই চলে যাবে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন, নিয়মিত ভাতা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ এবং মূলধনি ব্যয়সহ নানাবিধ পরিচালন খাতে। আর দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বাকি ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে যা বাস্তবায়নে সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা যার সিংহভাগ অর্থাৎ ৬ লাখ ৪path হাজার কোটি টাকাই আদায় করতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে।
বাজেটের এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি রিজওয়ান উর রহমান এবং লেদারগুডস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর জানান ঘন ঘন অর্থনৈতিক ও কর নীতি পরিবর্তনের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসতে ভয় পাচ্ছেন। কর হারের অস্থিরতা দূর করে বাজেটে একটি স্থায়ী ও স্থিতিশীল করনীতি প্রণয়ন করা না গেলে এবং দেশের মোট কর আদায়ের ৭৮ শতাংশই যদি উৎস কর কর্তন বা টিডিএস থেকে আসে তবে তা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়ে বাজার প্রতিযোগিতা নষ্ট করবে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও চলতি বছরের ১ লাখ কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব ঘাটতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সতর্ক করেছেন যে নতুন বাজেটে জোর করে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গেলে ব্যবসায়ীরা কর সন্ত্রাসের শিকার হতে পারেন তাই দ্রুত এনবিআরের নীতি ও বাস্তবায়ন শাখা আলাদা করা উচিত।
আসন্ন এই বাজেটকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে উচ্চাভিলাষী এবং কাঠামোগতভাবে অনেকাংশে গতানুগতিক বলে আখ্যায়িত করেছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি এবং সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ডক্টর মোস্তাফিজুর রহমান। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন ও অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই চরম সংকটের সময়ে একদিকে সরকারের সম্প্রসারণমূলক বাজেট আর অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে নতুন অর্থমন্ত্রীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর বাজেট বক্তব্যের শেষাংশে এই মেগা বাজেটকে ডিফেন্ড করে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে সবার আগে বাংলাদেশ দর্শনের ভিত্তিতে প্রণীত এই ব্যাপক সামাজিক পরিকল্পনা দেশের সুশাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে প্রিয় জন্মভূমিকে একটি টেকসই ও বাস্তব উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
মন্তব্য করুন