নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার ঠিক পরপরই নিউইয়র্কের বিখ্যাত টাইমস স্কয়ারে শুরু হয়ে যায় স্প্যানিশ দল ‘লা রোহা’র উল্লাস ও উন্মাদনা। অনেকের কাছেই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে স্পেনের এই জয় নিছক কোনো সাধারণ জয় নয়; বরং ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টে তরুণদের নিয়ে গড়া এক অদম্য দলের ঐতিহাসিক পথচলার পর এটি বিশ্ব ফুটবলে আরও এক বিশাল পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। মাত্র ছাব্বিশ বছর গড় বয়সের একটি তারুণ্যনির্ভর স্কোয়াড এবং ১৯ বছর বয়সী বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামালকে সামনে রেখে স্প্যানিশ ফুটবলের এক নতুন সোনালি যুগের সূচনাই যেন নির্দেশ করছে এই বিশ্বজয়।
সমর্থকদের ভিড়ে ৩৩ বছর বয়সী জোয়ান ওয়াসনের মতে, এই মুহূর্তটি যেন এক পরম নিয়তি। অতীতে লিওনেল মেসির কোলে শিশু ইয়ামালের স্নান করানোর সেই বিখ্যাত ভাইরাল ছবিটির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘মেসির লামিনকে গোসল করানোর সেই ছবিটা আমরা সবাই দেখেছি, আর আজ ফাইনালে এসে মেসি নিজেই তার হাতে ট্রফি তুলে দিচ্ছেন।’
অবশ্য এই ফাইনাল ম্যাচটি স্পেনের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। ম্যাচে স্প্যানিশরা বলের দখলে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখলেও এবং একের পর এক আক্রমণ তৈরি করলেও মেসি-নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনা নিজেদের প্রমাণ করেছে অত্যন্ত নাছোড়বান্দা এক প্রতিপক্ষ হিসেবে। অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্কোরলাইন গোলশূন্য রাখতে সক্ষম হয়েছিল তারা। এমনকি ম্যাচের ৯৩তম মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে আর্জেন্টিনা ১০ জনের দলে পরিণত হলেও, তার তাৎক্ষণিক কোনো নেতিবাচক প্রভাব আলবিসেলেস্তেদের রক্ষণে পড়েনি। ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণকারী সেই মুহূর্তটি আসে আরও অনেক পরে, ১০৬ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেসের দুর্দান্ত এক গোলে।
ইংল্যান্ড থেকে আসা আজীবন স্পেন সমর্থক ২৭ বছর বয়সী চার্লি ওয়েবস্টার বলেন, ‘স্পেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং তাদের জয়টাই পুরোপুরি প্রাপ্য ছিল। তবে আর্জেন্টিনা ভালোভাবেই জানে কীভাবে কঠিন ম্যাচগুলো বের করে আনতে হয়। খেলা যদি টাইব্রেকারে গড়াতো, তবে ফল লটারির মতো হতে পারত বলে আমি কিছুটা নার্ভাস ছিলাম।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যে দলই খেলুক না কেন, গ্যালারিতে তাদের সমর্থকদের উপস্থিতি প্রতিপক্ষকে কিছুটা চাপে ফেলে দেয়। তবে দিনশেষে সেরা দলটিই জিতেছে।’
খেলা দেখতে সরাসরি স্পেন থেকে উড়ে আসা ৪২ বছর বয়সী সারে মনজোনের কাছে এই জয়টি নিজ দেশের জন্য আরও অনেক বেশি গভীর তাৎপর্য বহন করে। ২৩ বছর বয়সী মিডফিল্ডার পেদ্রি এবং ১৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার পাউ কুবারসির মতো তরুণদের নিয়ে গড়া স্পেনের এই স্কোয়াড সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা দলটিকে নিয়ে ভীষণ, ভীষণ গর্বিত। আমার মনে হয়, একটি জাতি হিসেবে আমাদের ভেতরে যে অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে, এই ছেলেরা তারই নিখুঁত প্রতিনিধিত্ব করছে।’
স্পেন থেকে আসা আরেক সমর্থক ব্রায়ান ল্যাসি ফুটবল প্রতিভার এই ঐতিহাসিক পালাবদল দেখছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তার মতে, ‘এটি মূলত একটি নতুন প্রজন্মের আনুষ্ঠানিক সূচনা। এটি এক বিশাল প্রজন্মগত পরিবর্তন, কারণ বিশ্ব ফুটবলে মেসির অধ্যায় এখন আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ, আর এখন সময় পুরোপুরি লামিন ইয়ামালের।’ নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এরপর আমাদের লক্ষ্য কী? ইউরো কিংবা পরবর্তী বিশ্বকাপ? খেলাধুলার দুনিয়ায় ফুটবলের আসন সবার ওপরে, আর আজ স্পেন সেই বিশ্ব ফুটবলের একদম শীর্ষে অবস্থান করছে। অতীতের হিসাব না কষে, ভবিষ্যতের কথা না ভেবে আমাদের শুধু এই মুহূর্তটি উপভোগ করা উচিত যে আমরা এখন বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।’
এক যুগের অবসানে আর্জেন্টিনার ভক্তদের ভাবনা অন্যদিকে, ফাইনালে ট্রফি হাতছাড়া হওয়ার তীব্র বেদনার পাশাপাশি এই হারের মধ্য দিয়ে দেশকে ফুটবলের স্বর্ণোজ্জ্বল দিনে ফিরিয়ে আনা এক মহাতারকার প্রায় নিশ্চিত বিদায়ের কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন আর্জেন্টিনার হতাশ ভক্তরা। টাইমস স্কয়ারের উল্লাসের মাঝেও হাতে মেসির একটি পুতুল আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা লিলি নামের এক আর্জেন্টাইন সমর্থক নিজের পদবি প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘লিও যা আমাদের জন্য করেছে, তা ফুটবলের ইতিহাসে আর কেউ করতে পারেনি, এমনকি পেলে কিংবা ম্যারাডোনাও নয়। পেলে কেবল দুটি ফাইনাল খেলেছেন, আর মেসি আমাদের তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে গেছেন। তিনি আমাদের জীবনকে অসংখ্য আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছেন।’
নিউজার্সির বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত মারভিন রেয়েসের মতে, জাতীয় দলে মেসির ভূমিকা ছিল মূলত একজন রূপান্তরকারীর মতো, যিনি ২০২২ সালে কাতারে ৩৬ বছরের দীর্ঘ বিশ্বকাপ খরা ঘুচিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় দলের জন্য সে নিজের সব উজাড় করে দিয়েছে। সে দলের প্রতিটি খেলোয়াড়কে নতুন আশা জুগিয়েছে এবং একজন প্রকৃত নেতার মতো পুরো দলটাকে নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে গেছে।’
আর্জেন্টিনা থেকে আসা ৪৮ বছর বয়সী হোয়াকিন মার্টিনেজ বলছিলেন এক অন্য বাস্তবতার কথা। তার ১২ ও ১১ বছর বয়সী দুই ছেলে মেসি ছাড়া জাতীয় দলের অন্য কোনো বড় নেতাকে দেখেনি বা চেনে না। কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে ম্যারাডোনাই ছিল সবকিছু, কিন্তু আমার সন্তানদের কাছে সব মানেই কেবল মেসি। তবে এখন তো মেসি আর থাকবেন না, তাই সামনের দিনগুলোতে আর্জেন্টিনাকে ঘুরে দাঁড়াতে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হবে।’ আজকের এই হারের পর মন কিছুটা খারাপ হলেও ফুটবলের আপন নিয়মকে মেনে নিয়ে তিনি জানান, এটাই মূলত ফুটবল।
মন্তব্য করুন