ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর দীর্ঘদিনের তথাকথিত ‘নিরাপত্তা ও সুরক্ষার’ ধারণাকে এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ও স্থায়ী সামরিক ঘাঁটিগুলোর কৌশলগত দুর্বলতা এখন আন্তর্জাতিক মহলে পুরোপুরি উন্মোচিত। ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের ক্রমাগত ড্রোন ও নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পেন্টাগন এখন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি টিকিয়ে রাখা নিয়ে গভীর সংশয়ে পড়েছে। যদিও ইরান যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির প্রধান শর্ত হিসেবে এই অঞ্চল থেকে সব মার্কিন সেনা ও ঘাঁটি প্রত্যাহারের জোরালো দাবি জানাচ্ছে; তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, ইরান তাগিদ না দিলেও পেন্টাগনকে হয়তো বাধ্য হয়েই এই অঞ্চল থেকে তাদের ঘাঁটির আকার ছোট করতে হবে এবং গুটিয়ে নিতে হবে বড় বড় আয়োজন।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন যুদ্ধের এই আধুনিক যুগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ও স্থায়ী ঘাঁটিগুলো এখন প্রতিপক্ষের জন্য অত্যন্ত সহজ লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মাঝেই নতুন করে লড়াই শুরু হলে মার্কিন সামরিক ব্যবস্থার এই নাজুক চিত্রটি আবারও সামনে আসে। মার্কিন হামলার জবাবে ইরান কুয়েতে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ঘাঁটিতে সরাসরি আঘাত হানে। যদিও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম দাবি করেছে যে তারা সব ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করেছে, তবে 'সোর অ্যাটলাস' নামের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্যাটেলাইট চিত্রে কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমান ঘাঁটির একটি সামরিক শেলটার ধ্বংস হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি টার্মিনালও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। বর্তমান ও সাবেক শীর্ষ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন যে, কুয়েতসহ পারস্য উপসাগরের উপকূলীয় মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন কার্যত সম্পূর্ণ অরক্ষিত।
এর আগে ২০২২ সালে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলে ইয়ানবু শহরের কাছে 'এলএসএ জেনকিন্স' নামে একটি নতুন সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় এই ঘাঁটির তৎপরতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। এর মূল কারণ ছিল, ইরানের মূল ভূখণ্ডের একদম কাছাকাছি থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে অনবরত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হানছিল। সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা ও সেনা অ্যাটাশে আব্বাস দাহুক এই বিষয়ে বলেন, ইরানের উপকূলের একদম কাছাকাছি না থেকে, কিছুটা নিরাপদ কৌশলগত দূরত্ব বজায় রেখে মার্কিন রণকৌশলকে এগিয়ে নিতেই মূলত এই জেনকিন্স ঘাঁটিটি তৈরি করা হয়েছিল। চীন ও রাশিয়ার উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সরাসরি সহায়তায় ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র যেভাবে নিখুঁতভাবে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করেছে, তাতে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকেরা এখন স্থায়ী ঘাঁটির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন।
সিআইএ-র সাবেক পরিচালক এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস গত মে মাসে ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করেছেন। তিনি অত্যন্ত অকপটে বলেন, "সত্যি বলতে, ইরান যেভাবে এই ঘাঁটিগুলোতে নিখুঁত হামলা চালাতে সক্ষম তা দেখার পর, সেখানে আগের মতো অবস্থান ধরে রাখার আগ্রহ আমাদের অনেকটাই কমে গেছে। আমি যখন সেন্ট্রাল কমান্ডের দায়িত্বে ছিলাম, তখনকার পরিস্থিতি এখনকার চেয়ে অনেক ভিন্ন ছিল।" তিনি আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান যে, বর্তমান সেন্টাল কমান্ডের প্রধান বা সেন্টকম চিফ আগের কমান্ডারদের মতো যুদ্ধক্ষেত্রের একই টাইম জোনে সশরীরে অবস্থান করছেন না; বরং ফ্লোরিডার টাম্পা হেডকোয়ার্টার থেকেই দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো যুদ্ধ পরিচালনা করা হচ্ছে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ সামরিক বিশেষজ্ঞ মার্ক ক্যানসিয়ান এই পরিস্থিতিকে বর্ণনা করে বলেন, এই যুদ্ধ মার্কিন স্থায়ী ঘাঁটিগুলোর স্থায়ী দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামগ্রিক সামরিক অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে এবং এখানে খুব শিগগিরই বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধ মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে ওমানের মতো ‘হালকা উপস্থিতি’ ও কৌশলগত সুবিধার নীতি বা লজিস্টিক সাপোর্ট মডেলে যেতে বাধ্য করবে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে কুয়েতেই সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৪ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। সেখানকার দুটি বড় ঘাঁটি ‘ক্যাম্প আরিফজান’ এবং ‘আলি আল-সালেম বিমান ঘাঁটি’ ইরানের তীব্র হামলার শিকার হওয়ায় মার্কিন প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের (ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ব্যবস্থা) মজুত আশঙ্কাজনকভাবে ফুরিয়ে আসছে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন মাত্র ২০০টি 'থাড' (THAAD) ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট আছে, যা দিয়ে সব ঘাঁটি রক্ষা করা অসম্ভব।
এই পরিস্থিতির কারণে যুদ্ধের শুরুর দিকেই ইরান মার্কিন বাহিনীকে উপসাগরীয় উপকূল থেকে অনেক দূরে সরে যেতে বাধ্য করেছে। রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরান উপর্যুপরি হামলা চালানোর পর, গত মার্চেই মার্কিন বাহিনী সৌদি আরবের তায়েফ বিমান ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নিতে বাধ্য হয়। বর্তমানে বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, কাতারে সেন্ট্রাল কমান্ডের অগ্রবর্তী কার্যালয় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে আল ধাফরা বিমান ঘাঁটি থাকলেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নৌ-নিয়ন্ত্রণের কারণে এই পুরো নৌপথ এখন মার্কিন যুদ্ধজাহাজের জন্য অত্যন্ত অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। ফলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পেন্টাগন এখন পারস্য উপসাগরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে লোহিত সাগরের বিকল্প রুট ও জিজান বন্দরের মতো বিকল্প কৌশলগত অবস্থানগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাদের নতুন সামরিক মানচিত্র সাজাচ্ছে, যা প্রকারান্তরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের পিছু হটারই এক নীরব পূর্বাভাস।
মন্তব্য করুন