বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে আসায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশ এক চরম গ্যাস সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো কোনো দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ২০২৮ সালের মধ্যে শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া বা উৎপাদনের হার অর্ধেকে নেমে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই সংকট কেবল দেশের অর্থনীতিকেই স্থবির করে তুলবে না, বরং অসংখ্য শ্রমিকের কর্মসংস্থানকে হুমকির মুখে ফেলে দেবে।
বর্তমানে দেশের গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট, অথচ সরবরাহ রয়েছে মাত্র ২৬৫ কোটি ঘনফুট। তিতাস গ্যাস এলাকার ৪ হাজার ৫০০টিরও বেশি শিল্পকারখানা ও ক্যাপটিভ সংযোগের অধিকাংশই এখন গ্যাসস্বল্পতার কারণে উৎপাদন ব্যাহত করছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের ২২টি গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ক্ষমতা প্রতিবছর গড়ে প্রায় দেড় কোটি ঘনফুট করে কমছে। বিবিয়ানার মতো প্রধান ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে, যা সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতির আরও অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে নতুন শিল্পকারখানায় সংযোগের জন্য প্রায় ১ হাজার ৮০০টি আবেদন ঝুলে আছে, অন্যদিকে বিদ্যমান কারখানাগুলোই গ্যাস না পেয়ে বন্ধের উপক্রম হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং কূপ খননের পরিকল্পনার কথা বলা হলেও, গত পাঁচ মাসে এ সংক্রান্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। ভোলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। গত চার বছরে ২০টিরও বেশি কূপ খনন করেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও, কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সমঝোতা এবং কূপ খনন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন, যা বর্তমান সংকট নিরসনে দ্রুত কোনো সমাধান দিতে পারছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়মতো কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে দেশের শিল্প খাত এক ভয়াবহ ধসের সম্মুখীন হবে। অর্থনীতিতে এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব মোকাবিলায় এবং শিল্পকারখানাগুলোকে সচল রাখতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে জরুরি ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও কমতে থাকা সরবরাহের এই বিশাল ব্যবধান ভবিষ্যতে শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে অপূরণীয় ক্ষতির দিকে ঠেলে দেবে।
মন্তব্য করুন