মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আদালতের ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে ভারতে অবস্থান করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের দ্রুত ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দিল্লিকে কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর প্রথম আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাতে এই জোরালো প্রত্যর্পণের দাবি উত্থাপন করা হয়।
সোমবার (১০ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সৌজন্য সাক্ষাত অনুষ্ঠিত হয়। সাক্ষাৎ শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের পুরো বৈঠকের বিষয়বস্তু বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, বৈঠকে আইনগতভাবে দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবিলম্বে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুততর করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে। আমরা ভারতীয় পক্ষকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছি যে এই প্রক্রিয়াটি যেন দ্রুত ত্বরান্বিত করা হয় এবং আমরা আশা প্রকাশ করছি যে ভারত সরকার এই বিষয়ে একটি ইতিবাচক ও আইনসম্মত পদক্ষেপের দিকে এগিয়ে যাবে। পাশাপাশি, শহীদ ওসমান হাদির চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামিদের বিষয়ে তিনি বলেন যে, ভারত সরকারের চাহিদামাফিক যাবতীয় আইনি কাগজপত্র ও প্রমাণাদি তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর উল্লেখ করে যত দ্রুত সম্ভব সেই অভিযুক্ত হত্যাকারীদের বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণ করার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দেড় মাসের মাথায় ভারতীয় হাইকমিশনার আজ প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে এই সৌজন্য সাক্ষাতের সুযোগ পান। এই বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সামনের দিনগুলোতে আরও স্বাভাবিক ও গতিশীল করে তোলার জন্য একটি অনুকূল ও সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির ওপর যৌথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেন।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয় যেমন—সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং পুশ-ইন এর মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলো নিয়েও সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে বলে জানান খলিলুর রহমান। তিনি উল্লেখ করেন যে এই বিষয়গুলো মূলত প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার বিষয় নয়, বরং এর আগে গতকালই ভারতীয় হাইকমিশনারের সাথে তাঁর বৈঠকে এসব নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছিল।
বিগত ৫ আগস্টের বিভিন্ন ঘটনাবলি নিয়ে সম্প্রতি ভারতের কাছে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যে আনুষ্ঠানিক অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছিল, আজকের বৈঠকে সেই প্রসঙ্গটি পুনরায় গুরুত্বের সাথে উত্থাপিত হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন যে ৫ আগস্টের ব্যাপারে বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট ও কঠোর অবস্থান অত্যন্ত জোরালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সেই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছে এবং গতকাল ও আজকের বৈঠকে তারা তা উপলব্ধি করার কথা জানিয়েছে।
দিল্লিতে বসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কেবল দুঃখ প্রকাশের বিষয় নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিষয়টির গভীরতা বুঝতে হবে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান স্তম্ভ থাকে—নির্বাহী বিভাগ, আইন প্রণয়ন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ। দণ্ডিত আসামি শেখ হাসিনার সঠিক স্থান হলো জুডিশিয়ারি বা আদালতের কাঠগড়ায়। বাংলাদেশের একটি আদালত তাঁর বিরুদ্ধে বিচার সম্পন্ন করে তাঁকে চূড়ান্ত দণ্ড দিয়েছে। তাই দণ্ডিত কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে আইনগতভাবে যা হওয়ার কথা, তাঁকে হেফাজতে নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ৫ আগস্টের পর থেকে শেখ হাসিনা সরাসরি বাংলাদেশের বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তির বিরুদ্ধে নিয়মিত বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ করে যাচ্ছেন এবং অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে ভারত সরকার তাঁকে সেই সুযোগ করে দিচ্ছে। গতকাল ও আজ উভয় দিনই আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাদের জানিয়েছি যে বাংলাদেশের সমগ্র রাষ্ট্র কাঠামোর প্রতি সব দেশের যথাযথ শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। আমরা আশা করি, ভারতের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি পুরোপুরি অনুধাবন করতে পেরেছেন এবং ভবিষ্যতে আমাদের রাষ্ট্রের কোনো স্তম্ভকে খর্ব বা আন্ডারমাইন করার মতো কোনো কর্মকাণ্ডে তারা আর কাউকে প্রশ্রয় দেবেন না। তাদের সাথে সামগ্রিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে তিনি কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হয়েছেন যে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না।
দুই দেশের মধ্যকার বর্তমান টানাপড়েন কাটিয়ে সামগ্রিক সম্পর্ক কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে এমন এক প্রশ্নের জবাবে অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন যে তিনি কোনো জ্যোতিষী বা গণক নন, তাই সুনির্দিষ্ট করে কোনো দিন-তারিখ বলা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
মন্তব্য করুন