সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে একটি আবাসিক ভবনের ছাদে অভিযান চালিয়ে বিষাক্ত ট্যারান্টুলা মাকড়সা, ম্যাক্সিকান ব্ল্যাক কিং স্নেক এবং লেপার্ড গ্যাকোসহ ১ হাজার ১০৪টি বিদেশি প্রাণী উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। উদ্ধার করা প্রাণীর তালিকায় আরও রয়েছে কর্ণ স্নেক, ডামফি ফ্রগ এবং সাইডনেক কচ্ছপ। অথচ এই প্রাণীদের বাংলাদেশে আনা বা লালন-পালন করা আইনত নিষিদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রাণী কেবল পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ নয়, বরং এগুলো থেকে নতুন ধরনের রোগবালাই ছড়ানোর প্রবল ঝুঁকিও রয়েছে।
এই অবৈধ ব্যবসার পেছনের কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে দুটি প্রধান দিক। প্রথমত, বর্তমানে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শখের বসে বিদেশি প্রাণী লালন-পালনের প্রবণতা অনেক বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে একটি ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। থাইল্যান্ড কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে চোরাইপথে এসব প্রাণী বাংলাদেশে আনা হয় এবং পরবর্তীতে স্থলবন্দর ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার করে দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীরা বৈধ প্রাণী আনার আড়ালে কৌশলে এসব নিষিদ্ধ ও বিষাক্ত প্রাণী দেশে নিয়ে আসছে।
বিমানবন্দরগুলোতে কাস্টমস কর্মকর্তাদের নজরদারি থাকলেও বন্যপ্রাণী শনাক্তকরণে বিশেষায়িত দক্ষতার অভাবের সুযোগ নিচ্ছেন পাচারকারীরা। অনেক সময় অ্যাকুরিয়ামের মাছ কিংবা অর্কিডের প্যাকেটের ভেতর করে অতি সূক্ষ্মভাবে এসব প্রাণী আনা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিমানবন্দরে ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ অফিস থাকা জরুরি, যেখানে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা সরাসরি কাজ করতে পারবেন।
বিদেশি প্রাণীর অবাধ প্রবেশ দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিদেশি কোনো প্রাণী আমাদের পরিবেশের সাথে মিশে গেলে তা স্থানীয় প্রজাতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া, কোয়ারেন্টাইন না করে সরাসরি প্রাণী দেশে আনার ফলে এগুলো থেকে নতুন কোনো ভাইরাস বা রোগ মানুষের শরীরে ছড়ানোর ভয়ও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনের প্রয়োগ আরও কঠোর করতে হবে এবং এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, এসব অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও, পাচারকারীরা প্রায়ই পার পেয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ ও প্রাণিকুল রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সীমান্তে ও প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
মন্তব্য করুন