অবশেষে অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে। বিশ্বফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট কার মাথায় উঠছে, তা নির্ধারণ করতে আজ নিউ জার্সিতে মুখোমুখি হচ্ছে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে ধারাবাহিক দুটি দলের এই ফাইনাল কেবল দুই দেশের লড়াই নয়, বরং এটি ফুটবলীয় কৌশলের এক পরম প্রদর্শনী। স্পেনের নিখুঁত ও সুশৃঙ্খল দলগত রসায়নের বিপরীতে আটলান্টায় দেখা গেছে আর্জেন্টিনার লড়াকু মনোভাব এবং লিওনেল মেসির জাদুকরী নেতৃত্ব। মাঠের এই মহাযুদ্ধের ভাগ্য মূলত গড়ে দেবে সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিগত ও কৌশলগত দ্বৈরথ।
মাঠের লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হবে মাঝমাঠে, যেখানে স্পেনের রদ্রির সঙ্গে লড়বেন আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ ও ম্যাক অ্যালিস্টার। ফরাসিবাহিনীর বিপক্ষে রদ্রি প্রমাণ করেছেন তিনি নিজের সেরা ছন্দে রয়েছেন। তাকে আটকাতে এনজো এবং অ্যালিস্টারকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করা চলবে না। রদ্রি যদি বল পায়ে একটুও জায়গা পান, তবে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ স্পেনের হাতে চলে যাবে। তবে আর্জেন্টিনার এই মিডফিল্ড জুটিও স্পেনের রক্ষণাত্মক দুর্গ কাঁপিয়ে দেওয়ার পূর্ণ সামর্থ্য রাখে।
গোলপোস্টের নিচেও থাকছে দারুণ এক স্নায়ুযুদ্ধ। চলতি আসরে স্পেনের উনাই সিমন মাত্র একটি গোল হজম করেছেন। তবে আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্তিনেজের অবিশ্বাস্য শট-স্টপিং এবং মনস্তাত্ত্বিক জাদুকরী ক্ষমতা প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ আজ উনাই সিমনকে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে, যা ফাইনালের অন্যতম বড় আকর্ষণ।
আক্রমণভাগের লড়াইয়ে মিকেল ওইয়ারজাবালের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হুলিয়ান আলভারেস অথবা লাউতারো মার্তিনেজের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। স্পেনের জন্য নিভৃতচারী নায়ক হয়ে উঠেছেন ওইয়ারজাবাল, যিনি দলের আক্রমণভাগকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছেন। অন্যদিকে, অফ-ফর্মে থাকা আলভারেজকে সরিয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করা মার্তিনেজকে শুরুর একাদশে ফেরানোর দারুণ এক মধুর সমস্যায় রয়েছেন কোচ লিওনেল স্কালোনি।
মাঠের আরেক প্রান্তে লিওনেল মেসির সঙ্গে মার্ক কুকুরেয়ার লড়াইটি ফাইনালের দৃশ্যপট বদলে দিতে পারে। ৩৯ বছর বয়সেও মেসি ডান প্রান্ত ব্যবহার করে যেকোনো ফুল-ব্যাককে বোকা বানানোর জাদুকরী ক্ষমতা রাখেন। কুকুরেয়াকে তাই রক্ষণভাগে চরম সতর্ক থাকতে হবে। তবে মেসি যেহেতু রক্ষণাত্মক কাজে খুব একটা অংশ নেন না, তাই অতিমাত্রায় আক্রমণাত্মক কুকুরেয়া ওভারল্যাপ করে স্পেনের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারেন। এই আক্রমণ ঠেকানোর জন্য রদ্রিগো দে পল বা জুলিয়ানো সিমেওনেকে বাড়তি দায়িত্ব নিতে হতে পারে।
তরুণ প্রতিভার সঙ্গে অভিজ্ঞতার লড়াইয়ে লামিন ইয়ামালের মুখোমুখি হবেন নিকোলাস তাগলিয়াফিকো। ১৯ বছর বয়সি ইয়ামালের অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং স্পেনের অন্যতম বড় অস্ত্র। তবে কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে উসমান দেম্বেলেকে বোতলবন্দি করে রাখা ৩৩ বছর বয়সি তাগলিয়াফিকোর অভিজ্ঞতাও কম নয়। ইয়ামালকে থামাতে হলে এই আর্জেন্টাইন লেফটব্যাককে এনজো বা লিসান্দ্রো মার্তিনেজের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হবে।
সবশেষে, ডাগআউটে দুই মাস্টারমাইন্ড লুইস দে লা ফুয়েন্তে ও লিওনেল স্কালোনির কৌশলগত দাবার চালই নির্ধারণ করবে শিরোপার চূড়ান্ত গন্তব্য। টুর্নামেন্টজুড়ে স্প্যানিশ কোচ তার স্কোয়াডকে যেভাবে ক্ষুধার্ত ও সুশৃঙ্খল রেখেছেন, তাতে তার দল এখন পুরোপুরি গোছানো। অন্যদিকে স্কালোনিকে তার কৌশল নিয়ে অনেক বেশি ভাবতে হবে। স্পেনের মতো নিখুঁত দলের বিপক্ষে একবার পিছিয়ে পড়লে আলবিসেলেস্তেদের জন্য ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব হতে পারে। তাই প্রথম বাঁশি বাজানোর পর থেকেই স্কালোনির ওপর সঠিক কৌশল বেছে নেওয়ার এক প্রবল মনস্তাত্ত্বিক চাপ থাকবে।
মন্তব্য করুন