ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন পেনাল্টি স্পটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন কোনো ফুটবলার, তখন পুরো পৃথিবী যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায়। ১২ গজের সেই ছোট দূরত্বটিই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও ভারি পথ। সামনে গোলপোস্টের প্রহরী আর পেছনে কোটি মানুষের প্রত্যাশা এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ফুটবলার পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষে পরিণত হন। বিশ্বকাপ কেবল আনন্দের উৎসব নয়, এটি অনেক সময় চরম ট্র্যাজেডিরও আখ্যান। পেনাল্টি মিসের সেই কয়েক সেকেন্ডের ব্যর্থতা হয়তো কোনো কিংবদন্তির বর্ণিল ক্যারিয়ারকে ছোট করতে পারে না, কিন্তু তার বুকের ভেতর এক আজীবনের রক্তক্ষরণ সৃষ্টি করে।
২০২৬ বিশ্বকাপের আসরেও এমন পেনাল্টির নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসিকে। গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়া এবং শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করে তিনি গড়েছেন এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড। তবুও মেসি সেই মুহূর্তের হতাশা ঝেড়ে ফেলে দলকে ঘুরে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। এটিই একজন প্রকৃত লিজেন্ডের পরিচয়। তবে বিশ্বকাপের ক্যালেন্ডারে চার বছর দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান, আর সেই পেনাল্টি মিসের স্মৃতি একজন ফুটবলারের ঘুমে হানা দেয় বছরের পর বছর। ড্রেসিংরুমের সেই তীব্র নীরবতা আর মাথায় ঘুরতে থাকা ‘আরেকটি সুযোগ যদি পেতাম’ এমন আর্তনাদই বিশ্বকাপের সবচেয়ে অন্ধকার দিক।
ইতিহাস বরাবরই বড় নিষ্ঠুর। সে একজন ফুটবলারের পুরো ক্যারিয়ারের সাফল্যকে এক মুহূর্তের ভুলে ম্লান করে দিতে দ্বিধা করে না। ১৯৯৪ সালের রবার্তো বাজ্জিওর সেই পেনাল্টি মিস কিংবা ২০২২ সালের হ্যারি কেইনের গোলবারের ওপর দিয়ে শট পাঠানোর মুহূর্তগুলো আজও ফুটবলপ্রেমীদের কাঁদায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচনা কিংবা বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের শিরোনামের আড়ালে যে মানুষটি লুকিয়ে থাকেন, তিনি একজন বাবা, একজন স্বামী কিংবা কারও সন্তান। মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও বড় সত্য হলো, ম্যাচ শেষে যখন পৃথিবী তাকে খলনায়ক বানাতে ব্যস্ত থাকে, তখনও তার ড্রেসিংরুমে বসে থাকা সেই বিষণ্ণ মুখটি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
ফুটবল একইসঙ্গে ভাঙতে ও গড়তে জানে। যে পেনাল্টি মিস আজ একজন ফুটবলারকে নিঃসঙ্গ করে দেয়, পরদিন সকালেই সেই খেলোয়াড় আবার অনুশীলনের মাঠে ফিরে আসেন। নতুন দিনের সূর্য ওঠে, আবার বল গড়াতে শুরু করে এবং সেই ১২ গজের সামনেই নতুন কোনো বীরের জন্ম হয়। বিশ্বকাপ প্রতি চার বছর পরপর যেমন নতুন চ্যাম্পিয়ন উপহার দেয়, তেমনি কিছু মানুষের মনে রেখে যায় না মেটানো আক্ষেপ। ইতিহাসের পাতায় ট্রফিজয়ীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকলেও, সেই নীরব বিষণ্ণতা আর পেনাল্টি স্পটের সেই অমোঘ মুহূর্তগুলো মানুষের হৃদয়ের গভীরে এক চিরস্থায়ী ক্ষত হয়ে বেঁচে থাকে।
মন্তব্য করুন