নেপাল ও চীন (তিব্বত) সীমান্তে এক ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও তার ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা এবং কাদাপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি উপত্যকার একাধিক জনপদ ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত নেপালে ১৬৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৮২৬ জন। অন্যদিকে তিব্বত অঞ্চলেও ব্যাপক প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ চালাতে মোতায়েন করা হয়েছে সেনা ও হেলিকপ্টার।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) এবং স্থানীয় জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক এই ভয়াবহতার মূলে রয়েছে ৫.২ মাত্রার একটি বিশাল গ্লেসিয়ার বা হিমবাহ ধস। মূলত হিমালয়ের বরফ ও পাথরের আকস্মিক এই ধসের কারণে নদীগুলোর গতিপথ বন্ধ হয়ে মুহূর্তের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানির উচ্চতা বহুগুণ বেড়ে যায়। নেপালের ত্রিমুখী পাহাড়ি অঞ্চলে ত্রিশূলী নদীর পানি মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ২৭ ফুট পর্যন্ত ওপরে উঠে যায়, যা নিমেষেই রাস্তাঘাট, সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ঘরবাড়ি মাটির নিচে চাপা দিয়ে দেয়। নেপালের নুওয়াকোট এবং রাসওয়া জেলা এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের গিয়িরং বন্দরসংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় ভূমিধসের কারণে রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তিব্বতের এই অংশে ৫৫৮ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। অন্যদিকে নেপালে নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছাড়াও কৈলাস মানসসরোবর তীর্থযাত্রায় যাওয়া ভারতীয় পুণ্যার্থীরাও রয়েছেন। উদ্ধারকর্মীরা এখন পর্যন্ত হেলিকপ্টার অভিযানের মাধ্যমে শত শত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়েছেন এবং আহতদের রাজধানী কাঠমান্ডুতে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলে যাওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে, যা এই অঞ্চলের জনবসতি ও অবকাঠামোর জন্য চরম এক অস্তিত্ব সংকট তৈরি করছে। গত ১৪ মাসের মধ্যে একই নদী অববাহিকায় এমন বড় ধরনের আকস্মিক বন্যা দ্বিতীয়বারের মতো আঘাত হানল। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং হিমালয় অঞ্চলে দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ভয়াবহ এই মানবিক সংকটে নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আধ্যাত্মিক নেতারা।
মন্তব্য করুন