দীর্ঘ সাত বছরের দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল চমক দিয়ে উত্তর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সোমবার পিয়ংইয়ংয়ে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষনেতা কিম জং উনের সঙ্গে তাঁর এই বহুল প্রতীক্ষিত ও হাই-ভোল্টেজ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান দূরপাল্লার সামরিক কর্মসূচি এবং এশীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্যেই শি জিনপিংয়ের এই আকস্মিক সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলগত চাল বলে মনে করছেন বৈশ্বিক কূটনীতিবিদরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শি জিনপিংয়ের বিদেশ সফরের প্রবণতা অনেকটাই কমে এসেছে এবং বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তির নেতারা যেখানে বেইজিংয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, সেখানে শি জিনপিং নিজে পিয়ংইয়ং সফরে যাওয়া বেইজিংয়ের কাছে এই সফরের অনন্য গুরুত্বকে ফুটিয়ে তোলে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে শি প্রতি বছর গড়ে ১৪টি বিদেশ সফর করলেও ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তা বার্ষিক মাত্র ৬টিতে নামিয়ে এনেছিলেন, যা তাঁর এই সফরের পেছনের গভীর রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের এই আকস্মিক পিয়ংইয়ং সফরের মূল ও প্রধান কারণ হতে পারে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার অতিমাত্রায় সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বেইজিংয়ের মনে বাড়তে থাকা তীব্র উদ্বেগ। ঐতিহ্যগতভাবে চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার সম্পর্কে বেইজিং সবসময়ই একচ্ছত্র ‘বড় ভাই’ বা প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ থেকেছে, যার বড় প্রমাণ উত্তর কোরিয়ার মোট বাণিজ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশই এককভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের পর থেকে পূর্ব এশিয়ার এই চিরন্তন ক্ষমতার সমীকরণে নাটকীয় বদল আসতে শুরু করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ক্রেমলিনের সামরিক চাহিদাকে সচল ও চাঙ্গা রাখতে উত্তর কোরিয়া দেদারসে অস্ত্র, অত্যাধুনিক গোলাবারুদ ও লজিস্টিক সৈন্য সরবরাহ করে আসছে এবং বিনিময়ে মস্কোর কাছ থেকে বিপুল গোপন সুবিধা লুফে নিচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতনামা ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি’র এক চাঞ্চল্যকর তথ্যমতে, ২০২৩ সাল থেকে উত্তর কোরিয়াকে এই সৈন্য ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের সরাসরি বিনিময়ে প্রায় ১৪.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে ভ্লাদিমির পুতিনের মস্কো। যার বড় অংশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইটের নজরদারি সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে গোপন সামরিক প্রযুক্তি এবং নিখুঁত পারমাণবিক যন্ত্রাংশ হিসেবে পিয়ংইয়ংয়ের হাতে নিরাপদে পৌঁছে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক গবেষক ও সাংবাদিক লি সাং ইয়ং জানান, উত্তর কোরিয়ার ওপর ক্রেমলিনের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত প্রভাবের পরিধি নিয়ে বেইজিং প্রশাসন অত্যন্ত সতর্ক ও চিন্তিত। চীন মূলত উত্তর কোরিয়ার ওপর তাদের পূর্বের একচেটিয়া প্রভাব পুনরুত্থান করতে চায়, যাতে পিয়ংইয়ং কোনোভাবেই পুরোপুরি মস্কোর অক্ষের দিকে ঝুঁকে না পড়ে। আর এই প্রভাব যেকোনো মূল্যে বজায় রাখতে চীন এবার উত্তর কোরিয়াকে নতুন করে বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনা, খাদ্য ও জ্বালানি সহায়তার এক বিশাল প্যাকেজ প্রস্তাব দিতে পারে।
পাশাপাশি, উত্তর কোরিয়ার হাতে রাশিয়ার উন্নত সামরিক ও পারমাণবিক প্রযুক্তি চলে আসার বিষয়টিও চীনের নিজস্ব সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য এক বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, বেইজিং সবসময়ই উত্তর কোরিয়াকে সামরিক ও পারমাণবিক সহায়তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ছিল, কারণ উত্তর কোরিয়া অতিরিক্ত সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠলে তা কোরীয় উপদ্বীপের সার্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চিরতরে নষ্ট করতে পারে। ইতোমধ্যে চলতি বছরের শুরু থেকে উত্তর কোরিয়া আটটি বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত ট্যাক্টিক্যাল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উন্মোচন করেছে। এদিকে কোরীয় উপদ্বীপের বর্তমান তীব্র অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানও চীনের এই সফরকে বেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং সিউলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছে যে শি জিনপিংয়ের এই সফর কোরীয় উপদ্বীপের সংকট নিরসনে একটি গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে, কিম জং উনের ওপর রাশিয়ার গভীর ছায়া নিয়ন্ত্রণ করা এবং পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন মিত্রদের তৎপরতার মুখে নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই এখন শি জিনপিংয়ের এই সফরের পর্দার আড়ালের মূল লক্ষ্য।
মন্তব্য করুন