সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পথে বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। অর্থ বিভাগের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই নতুন বেতনকাঠামো একবারে নয়, বরং দুই ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন কাঠামোর মূল বেতন কার্যকর হতে পারে। তবে বেতনভাতা বা আনুষঙ্গিক অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কার্যকর করার সময়সীমা ধরা হয়েছে ২০২৭-২৮ অর্থবছর।
বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন: প্রাথমিকভাবে বেতনকাঠামো তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি প্রস্তাব থাকলেও, নানাবিধ জটিলতার কারণে সরকার তা দুই ধাপে নামিয়ে এনেছে। বাস্তবায়ন কমিটি পর্যবেক্ষণ করেছে যে, তিন ধাপে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কারণে অনেক কর্মচারীর প্রকৃত বেতন বৃদ্ধি খুব সামান্য হতো, এমনকি কারো কারো বেতন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। এসব আপত্তি মাথায় রেখে কমিটি এখন আগামী জুলাই থেকে পূর্ণাঙ্গ নতুন মূল বেতন এবং পরবর্তী অর্থবছরে নতুন ভাতা কার্যকরের সুপারিশ করছে।
নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ ও আর্থিক প্রভাব: বর্তমানে অষ্টম বেতনকাঠামো অনুযায়ী সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা মূল বেতন চালু আছে। নবম বেতন কমিশন সর্বনিম্ন ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল বেতন নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল। কমিশনের হিসাব মতে, এই কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের নতুন বেতন-ভাতা সমন্বয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত: নতুন এই পে-স্কেল নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ জানিয়েছেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা থাকলে একবারে বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে ভালো হতো, তবে দুই ধাপে বাস্তবায়ন করাও একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। একই সঙ্গে তিনি রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, বেতন বৃদ্ধির ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ এবং দুর্নীতিমুক্ত কর্মসম্পাদনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য বলে তিনি মত দিয়েছেন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনও বেতন সমন্বয়ের যৌক্তিকতাকে স্বীকার করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করেছেন যে, এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের আগে সরকারের বাজেট ঘাটতি, ঋণ গ্রহণের পরিমাণ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমানে বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আলাদাভাবে তৈরি বেতনকাঠামোর প্রতিবেদনগুলো চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং এখন কেবল প্রজ্ঞাপন জারির অপেক্ষায় রয়েছে।
মন্তব্য করুন