এ দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে পেছনে ফেলে রেখে কখনোই দেশের প্রকৃত ও সুষম উন্নয়ন অর্জন করা সম্ভব নয় বলে দৃঢ় মন্তব্য করেছেন ঢাকা জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা খানম। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, দেশের সার্বিক অগ্রগতির স্বার্থেই নারীদের উন্নয়নের মূলধারার সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং তাদের আর্থিকভাবে পুরোপুরি স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে হবে। কারণ দিনশেষে নারী সমাজ এগিয়ে গেলেই একটি পরিবার, সমাজ এবং পরিশেষে সমগ্র দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর ঢাকা জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইইডি)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এসপিআরই (SPRE) প্রকল্পের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন থেকে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো বলেন। উন্নয়ন কখনোই কোনো বিচ্ছিন্ন বা স্বল্পমেয়াদি প্রক্রিয়া হতে পারে না উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন যে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রকৃত, অর্থবহ ও টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে দীর্ঘমেয়াদি, সর্বাত্মক অংশগ্রহণমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। আর এ ধরনের সুদূরপ্রসারী উন্নয়নের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হলো সমাজের অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া নারী সমাজকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসা এবং তাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।
নারীদের কেবল অনুদান বা সাময়িক সহায়তার ওপর চিরনির্ভরশীল না রেখে তাদের এমনভাবে দক্ষ ও সক্ষম করে তুলতে হবে, যাতে তারা নিজেদের সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ নিজেরাই আত্মবিশ্বাসের সাথে গড়ে তুলতে পারেন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রান্তিক স্তরের নারীদের কেবল প্রচলিত সাধারণ শিক্ষার গণ্ডিতে আটকে না রেখে বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা, আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), প্রয়োজনীয় কারিগরি শিক্ষা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণের চমৎকার সুযোগ সৃষ্টির ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সেবা প্রান্তিক নারীদের দোরগোড়ায় সহজে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে ঢাকা জেলা প্রশাসক বলেন যে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিভিন্ন কর্মসূচি, আইনি সহায়তা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবাসহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধাগুলো যেন নারীরা কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রিতা বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই নির্বিঘ্নে ও দ্রুত পেতে পারেন, তা প্রশাসনিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি আরও বলেন যে, দেশের বিভিন্ন উৎপাদনমুখী ও আয়বর্ধক কার্যক্রমের সাথে নারীদের সরাসরি যুক্ত করতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও পুঁজি সরবরাহ, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীদের নিজ হাতে উৎপাদিত পণ্য বিপণন ও বিক্রির সুব্যবস্থা তৈরি করা গেলে তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অর্জিত হবে।
পরিবার থেকে শুরু করে বৃহত্তর সমাজ ও স্থানীয় প্রশাসনিক পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের সক্রিয় মতামত এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্ব নিশ্চিত করার জোরালো আহ্বান জানান ডিসি ফরিদা খানম। পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় সামাজিক উন্নয়ন এবং বিভিন্ন এলাকার বহুমুখী সমস্যা সমাধানসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের অগ্রণী অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন যে, শুধুমাত্র সরকারের একার পক্ষে বা একক প্রচেষ্টায় নারীর কাঙ্ক্ষিত ক্ষমতায়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়; এর জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আইইডির মতো গতিশীল বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও), সচেতন নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় জনসাধারণকে নিয়ে একটি সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। ঢাকা জেলা প্রশাসন সর্বদা প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সার্বিক কল্যাণ এবং নারী অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি ঘোষণা করেন যে, এ ধরনের যেকোনো জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়নমুখী কার্যক্রমে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও প্রশাসনিক সমর্থন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে তিনি সমাজের প্রতিটি নারীকে নিজের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার সম্পর্কে পূর্ণমাত্রায় সচেতন হয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান এবং একই সাথে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
মন্তব্য করুন