বাঙালি কত প্রকার?"— প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে ব্যাকরণগত বা নৃতাত্ত্বিক মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে একটি গোটা জাতির মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক সংকটের চালচিত্র। বাংলা সাহিত্য, অভিধান আর সংস্কৃতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একসময় ‘খাঁটি বাঙালি’ মানেই ছিল বিশ্বসমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এক প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। যিনি মনে-প্রাণে সৎ, আদর্শিক এবং শুমারি-শুনানিতে একনিষ্ঠ। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এবং বৈশ্বিক রাজনীতি, সমাজনীতি ও ভূরাজনীতির নোংরা খেলায় সেই বাঙালি সমাজ আজ স্পষ্ট দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
কথাসাহিত্যিক রাজীব কুমার দাশের এক তীক্ষ্ণ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বাঙালির এই আত্মিক দেউলিয়াত্ব ও চরিত্রগত বিভাজনের চিত্র। তাঁর মতে, বর্তমান বাস্তবতায় বাঙালিকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করার সময় এসেছে:
১. খাঁটি বা সৎ বাঙালি: যারা নিজেদের অস্তিত্ব, সততা এবং নৈতিকতা ধরে রাখতে চান এবং সমাজ ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় ‘বদ বাঙালি’দের ছায়া এড়িয়ে চলেন।
২. বদ বা ভণ্ড বাঙালি: যারা রাষ্ট্রযন্ত্রের কোণায় কোণায়, আমলাতন্ত্রে, রাজনীতিতে, চিকিৎসায়, শিক্ষায় এবং বুদ্ধিজীবী সমাজে ঠাসাঠাসি করে বাস করছে এবং নিজেদের সুবিধাবাদী মানসিকতা দিয়ে সমাজকে পচিয়ে দিচ্ছে।
লেখক রাজীব কুমার দাশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সমাজে ‘বদ বাঙালি’দের চেনা এবং তাদের এড়িয়ে চলা কেন জরুরি, তার প্রধান কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
আদর্শিক দেউলিয়াত্ব ও দ্বিমুখী নীতি: বদ বাঙালিদের ব্যক্তিগত आकांक्षाর সাথে তাদের সামাজিক বা রাজনৈতিক অবস্থানের কোনো মিল থাকে না। তারা ব্যক্তিজীবনে চরম স্ববিরোধী আচরণ এবং দ্বিমুখী নীতি তীব্রভাবে উপভোগ করেন।
নিরপেক্ষ সুবিধাবাদ: এদের জীবনে বসন্তের আনন্দও নেই, আবার খরার ফুটিفاটাও নেই। এরা মূলত ‘মধ্যস্বত্বভোগী’ বা দালাল শ্রেণী। নিজের স্বার্থ ও ভোগের জন্য এরা ধর্ম, আধুনিকতা এবং সংস্কৃতিকে সুবিধামতো ব্যবহার করে।
তাত্ত্বিক চপেটাঘাতের ঊর্ধ্বে: এই ভণ্ডদের বিরুদ্ধে দেশের প্রথিতযশা লেখকেরা দলে দলে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই করেও ব্যর্থ হয়েছেন। বদ বাঙালিকে কোনো গালি বা শারীরিক শাস্তি দিয়ে বাগে আনা যায় না, অপরাধবোধের জায়গায় এরা সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন।
নৈতিক অবক্ষয় ও নারীর অবমাননা: এই বদ বাঙালি শাসিত সমাজে খুন ও খুনিরা যেন অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। এখানে নারীর ইজ্জত ও সম্মান তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয় এবং চোর, ডাকাত, প্রতারকদের কাছে ‘ধর্ষণ’ যেন বাজি ধরার ঘোড়ার মতো এক নারকীয় খেলায় পরিণত হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেমন আজ মানুষকে ‘মানব’ বনাম ‘পশু মানব’ হিসেবে চেনা যাচ্ছে, ঠিক তেমনি আমাদের এই জনপদেও আজ ‘খাঁটি বাঙালি’ বনাম ‘বদ বাঙালি’র দেয়ালটা স্পষ্ট। লেখক তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, আমাদের সামরিক, বেসামরিক কিংবা সার্বিক গোয়েন্দা সমাজসহ সর্বস্তরে যে ‘গোপন বাঙালি’রা মুখোশ পরে আছেন, তাদের চেনার সময় এসেছে।
খাঁটি ও সংবেদনশীল বাঙালি সমাজে আর কোনো ‘বারেক ভুল’ বা জাতীয় প্রতারণার সুযোগ দেওয়া যাবে না। বিশ্বসংসারে মান-সম্মান ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে হলে এবং নিজের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করতে হলে এই সুবিধাবাদী, ভণ্ড ও ছদ্মবেশী ‘বদ বাঙালি’দের চিহ্নিত করে সমাজ থেকে বর্জন করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
মন্তব্য করুন