নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের গড়মাটি পশ্চিমপাড়া গ্রামে বসবাসকারী ফাতেমা বেগমের বয়স জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী ১৩০ বছর ছুঁইছুঁই এবং তার একমাত্র সেবাদানকারী মেয়ে মানিকজানের বয়স প্রায় ১০০ বছর। বয়সের ভারী ভারে দুজনেই সম্পূর্ণ ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন এবং তাদের এই দীর্ঘ জীবনের পথচলা বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। পৃথিবীতে আপন বলতে আর কোনো নিকটাত্মীয় বেঁচে না থাকায় জীবনের একদম শেষ প্রান্তে এসেও এই অশীতিপর বৃদ্ধা মায়ের সার্বিক দেখভাল ও সেবা-যত্ন করে চলেছেন তারই শতবর্ষী কন্যা মানিকজান। স্বাধীনতার ঠিক পরপরই ফাতেমা বেগমের স্বামী ছাকেন সরকার মারা যান। তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে প্রতিবন্ধী একমাত্র ছেলে আব্দুল আজিজ প্রায় ১০ বছর আগে ৮০ বছর বয়সে মারা যান এবং তারও আগে অপর মেয়েটিও মারা গেলে এই মা-মেয়ে একে অপরের জীবনের একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠেন। নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ার মতো আর কোনো স্বজন না থাকায় প্রতিবেশীরা সাধ্যমতো তাদের সাহায্য করতেন, তবে তা দিয়ে জীবনকে নিরাপদ করা সম্ভব হয়নি। সরকারি ভোটার তালিকা অনুযায়ী ফাতেমা বেগমের জন্ম ১৯২৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর হলেও স্থানীয়দের দাবি তার প্রকৃত বয়স ১২৫ থেকে ১৩০ বছরের মধ্যে।
অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ এক ঘরে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এই মা-মেয়ের দিন কাটছিল। পাঠকাঠির বেড়া ও বহু পুরোনো টিনের ছাপড়া দেওয়া ঘরটি এতটাই নাজুক ছিল যে একটু বৃষ্টি হলেই চালের ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ত এবং খুঁটি ও তীরগুলো সম্পূর্ণ নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। যেকোনো মুহূর্তে ঘরটি ভেঙে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করতেন স্থানীয়রা। সম্প্রতি এই অসহায় মা-মেয়ের করুণ দুর্দশার কথা জানতে পেরে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘মানবিক সেবা ফাউন্ডেশন’। সংগঠনের চেয়ারম্যান শাহাদাত উল্লাহ নূর সুমন জানান যে ঘরটি পুরোপুরি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় প্রবাসীদের সহযোগিতায় দ্রুত একটি নিরাপদ ঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম এলাকার নিউইয়র্কপ্রবাসী জাহিদ আলম এই মহৎ কাজে এগিয়ে এসে মোট ৯৮ হাজার টাকা অর্থায়ন করেন। যার মধ্যে ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে ঘরের মেঝে পাকা করে, নতুন কাঠ-বাঁশ কিনে এবং টিনের বেড়া দিয়ে একটি সুন্দর দোচালা ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট টাকা দিয়ে মা-মেয়ের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল-ডালসহ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী কিনে দেওয়া হয়েছে। নতুন ঘর পেয়ে স্থানীয় এলাকাবাসীও অত্যন্ত আনন্দিত এবং বিত্তবানদের এমন মানবিক উদ্যোগ সমাজে মানবতার বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করেছে বলে জানান স্থানীয়রা।
নিজের অতীত জীবনের স্মৃতিচারণ করে ১৩০ বছর বয়সি ফাতেমা বেগম জানান যে ছোটবেলায় তালের পাতায় শিক্ষক দিয়ে তার লেখালেখির হাতেখড়ি হয়েছিল এবং তার নানার ১০ জোড়া মহিষসহ বিপুল পরিমাণ জমি ছিল, যখন তারা গরুর ও মহিষের গাড়িতে যাতায়াত করতেন। শতবর্ষী মেয়ে মানিকজান জানান যে বয়স লিখে না রাখলেও তাদের কষ্টের দিনগুলোর কথা তার মনে আছে, যেমন অতীতে তিনি ছয় আনা সের দরে চাল কিনে খাওয়ার কথা মনে রেখেছেন। মাকে তিনি নিজের সাধ্যমতো দেখার চেষ্টা করলেও এখন বয়স হওয়ায় একা গোসল করাতে পারেন না, তাই প্রতিবেশীদের ডেকে নেন। নতুন ঘর ও চাল-ডাল পাওয়ার পর এই অসহায় নারী আল্লাহর দরবারে সবার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস এই অসামান্য ঘটনাকে অত্যন্ত বিস্ময়কর ও মানবিক বলে উল্লেখ করে জানান যে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিনি নিজে খুব শীঘ্রই এই মা-মেয়কে দেখতে যাবেন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের নিয়মিত খোঁজখবর নিয়ে সাধ্যমতো সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবেন।
মন্তব্য করুন