চীনে দীর্ঘদিনের এক সন্তান নীতির মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবের ফলে সৃষ্ট তীব্র লিঙ্গ ভারসাম্যহীনতা এবং বিয়েতে প্রচলিত উচ্চ মূল্যের ‘ব্রাইড প্রাইস’ বা যৌতুকের সংস্কৃতিকে পুরোপুরি পুঁজি করে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু সংঘবদ্ধ প্রতারক ঘটকালি চক্র। অতি দ্রুত এবং সহজে বিয়ের চমৎকার প্রলোভন দেখিয়ে দেশটির সাধারণ ও সহজসরল হাজার হাজার অবিবাহিত পুরুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ ও মূল্যবান সম্পদ হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্রের সদস্যরা। সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার এই নির্মম বাস্তবতার শিকার হয়ে অনেক ভুক্তভোগী পুরুষই শেষ পর্যন্ত মারাত্মক মানসিক অবসাদ ও বিষণ্নতার কবলে পড়ছেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম বিবিসি প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো সামনে এসেছে। দীর্ঘ দশকব্যাপী চলা এক সন্তান নীতির সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কারণেই বর্তমানে চীনে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি বেশি রয়েছে। এর ফলে দেশটির বিভিন্ন ছোট শহর এবং প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার অসংখ্য অবিবাহিত পুরুষের জন্য নিজেদের পছন্দের বা উপযুক্ত একজন পাত্রী খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সুযোগটিকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়ে গুইঝৌসহ চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু বেআইনি ঘটকালি এজেন্সি ও প্রতারক চক্র। এই প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত চতুরতার সাথে পাত্র সংকটগ্রস্ত পুরুষদের দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দেয় এবং সেই সাথে সমাজে ‘ভালো স্ত্রী’ পাওয়ার নানা আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করে। বিশেষ করে তুলনামূলকভাবে আর্থিকভাবে সচ্ছল কিন্তু উপযুক্ত পাত্রী না পাওয়ায় হতাশ এমন পুরুষদেরই প্রধান টার্গেট করে থাকে এই চক্রগুলো। বিয়ের নাম করে এসব অসহায় পুরুষের কাছ থেকে আদায় করা হয় লাখ লাখ ইউয়ান এবং চড়া দামের যৌতুক। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পরপরই অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসল প্রতারণার ভয়াবহ রূপটি প্রকাশ পায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিয়ের কিছুদিন যেতে না যেতেই নববধূর ছদ্মবেশে কনে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে কৌশলে পালিয়ে গেছেন। আবার কোনো কোনো ঘটনায় কনের আগের একাধিক বিয়ে, গোপন সন্তান থাকা কিংবা গুরুতর স্বাস্থ্যগত জটিলতার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় তথ্যগুলো বিয়ের আগে সম্পূর্ণ সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা হয়, যা পরবর্তীতে প্রকাশ পেলে ভুক্তভোগীদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।
এই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারানোর একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হলো গুইঝৌর ৩৭ বছর বয়সি ওয়াং জুয়াং, যিনি একটি ঘটকালি এজেন্সির মাধ্যমে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। সেই বিয়ের পেছনে তাকে মোট তিন লাখ ইউয়ানের বেশি অর্থ খরচ করতে হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন কাটতেই তিনি জানতে পারেন যে তার নতুন স্ত্রী এর আগে আরও তিনবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, তার তিনটি সন্তান রয়েছে এবং তিনি শারীরিকভাবেও গুরুতর অসুস্থ। এই নির্মম প্রতারণার ফাঁদে পড়ার বিষয়টি উপলব্ধি করার পর থেকেই নিজের সম্মান ও অধিকার রক্ষায় ডিভোর্সের জন্য দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ওয়াং। একই সাথে তিনি নিজের মতো প্রতারণার শিকার হওয়া অন্যান্য ভুক্তভোগীদের নিয়ে একটি সচেতনতামূলক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি সমাজের সাধারণ মানুষকে এই চক্রগুলোর প্রতারণা থেকে সতর্ক করে চলেছেন। অপরদিকে, ৫৯ বছর বয়সি আরেক ভুক্তভোগী শু রুলিন তার আদরের ছেলের বিয়ের জন্য সারা জীবনের জমানো প্রায় পাঁচ লাখ ইউয়ান খরচ করেছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, সেই বিয়ের মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানেই কনে সমস্ত সুযোগ সুবিধা নিয়ে আকস্মিকভাবে পালিয়ে যান এবং বৃদ্ধ পিতার সমস্ত স্বপ্ন মুহূর্তেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।
চীনে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর ও প্রতারণামূলক ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বাড়তে থাকায় দেশটির সাধারণ জনমনে ব্যাপক জনরোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক প্রতারণার অভিযোগ প্রকাশ পাওয়ার পর অবশেষে বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়ে কঠোর পদক্ষেপের পথে হাঁটছে বেইজিং প্রশাসন। সে দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণে আনতে সম্প্রতি চীনের মোট পাঁচটি শীর্ষ সরকারি কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে দেশজুড়ে ম্যাচমেকিং বা ঘটকালি শিল্পের অনিয়মের বিরুদ্ধে একটি সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। তবে দেশের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীদের মতে, এই ধরনের অভিনব প্রতারণার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনে কিছু আইনি জটিলতা ও ফাঁকফোকড় রয়ে গেছে। সুনির্দিষ্ট কোনো ফৌজদারি অপরাধের ধারা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না থাকায় অনেক সময়ই অভিযুক্ত অপরাধীদের দ্রুত বিচার করা এবং প্রতারিত ও সর্বস্বান্ত হওয়া ব্যক্তিদের খোয়া যাওয়া কষ্টার্জিত অর্থ উদ্ধার করা বেশ কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
মন্তব্য করুন