ভারত ও পাকিস্তানের চিরবৈরী সম্পর্কের ইতিহাস পুরনো, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা এক নতুন ও জটিল মোড় নিয়েছে। এতদিন ধরে পাকিস্তানের পেছনের সারিতে চীন বা তুরস্কের মতো দেশগুলোর নাম শোনা গেলেও, এবার এই অক্ষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব। সম্প্রতি পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ভারতের কৌশলগত নীতিনির্ধাতকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই ত্রিদেশীয় মৈত্রী দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত বছরের জুলাই মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারতীয় সেনাপ্রধানের এক উপপ্রধান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, সীমান্ত সুরক্ষায় ভারতকে মূলত একযোগে তিন শক্তির মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যেখানে পাকিস্তান সরাসরি লড়াইয়ের মাঠে ছিল, চীন রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট ডেটা দিয়ে তথ্যগত সহায়তা জুগিয়েছিল এবং তুরস্ক পাকিস্তানকে কামিকাযে ড্রোন দিয়ে মদদ দিয়েছিল। সেই উত্তেজনার রেশ কাটতে না কাটতেই চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর যদি কেউ আক্রমণ চালায়, তবে তা তিন দেশের সবার ওপরই আক্রমণ হিসেবে ধরা হবে। এর সহজ অর্থ দাঁড়ায়, ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো সামরিক সংঘাত বাঁধলে, চতুর্থ দেশ হিসেবে সৌদি আরবও আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়ে যেতে পারে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই চুক্তিটিকে কেবল আত্মরক্ষামূলক বলে দাবি করলেও, ভারতের জন্য এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। কারণ ভারতের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত উষ্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য রয়েছে এবং ভারত তার জ্বালানি তেলের চাহিদার একটি বড় অংশ সৌদি আরব থেকেই আমদানি করে থাকে। কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠে রয়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে রিয়াদের ঐতিহাসিক ও গভীর সখ্যতা। দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে সৌদি আরব। তেল কেনার ক্ষেত্রে মূল্য পরিশোধে ছাড় দেওয়া কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রেখে পাকিস্তানকে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে রিয়াদ। শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, সামরিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। অতীতে পাকিস্তানি সেনারা সৌদি আরবের সুরক্ষায় কাজ করেছে এবং উভয় দেশ নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়।
অন্যদিকে, আধুনিক অস্ত্র আমদানির জন্য পাকিস্তান বর্তমানে তুরস্কের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। তুরস্কের তৈরি বিশ্বখ্যাত বায়্রাকতার ড্রোন এবং নৌবাহিনীর আধুনিক কর্ভেট যুদ্ধজাহাজ ইতোমধ্যে পাকিস্তান তাদের সামরিক বহরে যুক্ত করেছে। গত বছর ভারতের সঙ্গে সংঘাতের সময় পাকিস্তান তুর্কি ড্রোন ব্যবহার করায় ভারতও এর কঠোর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক জবাব দিয়েছিল। ভারতের তরফ থেকে তুর্কি কোম্পানির নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল করা এবং নাগরিকদের তুরস্ক ভ্রমণ বর্জন করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তান যদি তাদের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদের নীতি থেকে সরে না আসে, তবে এই নতুন তিন দেশের সামরিক মৈত্রী ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যদিও বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন চুক্তিটি পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মতো অতটা কঠোর ও শক্তিশালী নয় এবং এর নিজস্ব কোনো যৌথ কমান্ড বা যুদ্ধের নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার স্বার্থে ভারত কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে নারাজ। দিল্লি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে ভবিষ্যতে এই চুক্তির সুযোগ নিয়ে কেউ ভারতের ওপর কোনো ধরনের সম্মিলিত কৌশলগত চাপ তৈরি করতে না পারে।
মন্তব্য করুন