|
দ্রুত লিংক
বিভাগসমূহ
মিডিয়া বিভাগ
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : Aug 11, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন প্রধান মোহসেন রেজাই: কে এই কট্টরপন্থী নেতা?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র সংঘাত শুরুর দীর্ঘ পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর ইরানের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী সংস্থা সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এসএনএসসি) সচিব বা প্রধান হিসেবে কট্টরপন্থি হিসেবে সুপরিচিত নেতা মোহসেন রেজাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত সোমবার (১০ আগস্ট) দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং অভিজ্ঞ এই সামরিক-রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। এর মধ্য দিয়ে তিনি মোহাম্মদ বাঘের জোলকদরের স্থলাভিষিক্ত হলেন, যাকে পরবর্তীতে সর্বোচ্চ নেতার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, এসএনএসসি মূলত ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক পররাষ্ট্রনীতি সুচারুভাবে সমন্বয়কারী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থা, যার আনুষ্ঠানিক চেয়ারম্যান হলেন দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। একাত্তর বছর বয়সি মোহসেন রেজাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবন এবং উত্থানের ইতিহাস বেশ বৈচিত্র্যময় ও ঘটনাবহুল। ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লবের ঠিক পরপরই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসে (আইআরজিসি) যোগ দিয়ে সামরিক জীবন শুরু করেন রেজাই এবং অভাবনীয়ভাবে মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৮১ সালে তিনি আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর তিনি এই শক্তিশালী বাহিনীটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন, যার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলা রক্তক্ষয়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধ। তার প্রত্যক্ষ ও দীর্ঘ কমান্ডের আমলেই মূলত আইআরজিসির স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বহুগুণ সম্প্রসারিত হয়েছিল। বিপ্লবের সময় গোপন ও ভূগর্ভস্থ তৎপরতা থেকে উঠে আসা আইআরজিসির যে তরুণ প্রজন্ম পরবর্তীতে ইরানের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর একদম শীর্ষ পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার করে, মোহসেন রেজাই নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান মুখ।

আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডারের দায়িত্ব সফলভাবে ছাড়ার পরও তিনি বসে থাকেননি, বরং ইরানের মূলধারার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গনে একজন অত্যন্ত সক্রিয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে সবসময় নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট পদে তিনি একাধিকবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্থনৈতিক বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষাজীবনে তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে অত্যন্ত সুনামের সাথে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মর্মান্তিক প্রয়াণের পর তার সুযোগ্য পুত্র মোজতবা খামেনি যখন দেশের সর্বোচ্চ নেতার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন থেকেই রেজাইয়ের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের মার্চ মাসে তাকে মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা হিসেবেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চরম সংঘাত ও উত্তেজনার সময়গুলোতে মোহসেন রেজাই নিয়মিতভাবে গণমাধ্যমে অত্যন্ত আগ্রাসী ও কট্টর অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন। পশ্চিমা শক্তির সাথে যেকোনো ধরনের অর্থবহ আলোচনার বিষয়ে তিনি বরাবরই গভীর সংশয় প্রকাশ করে এসেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্দেশ্য করে নানা হুমকিও প্রদান করেছেন। চলতি বছরের এপ্রিল মাসের উত্তাল দিনগুলোতে রেজাই হুংকার দিয়ে বলেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে কোনো ধরনের স্থল অভিযান চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে সেটি তাদের জন্য ‘দারুণ’ বুমেরাং হবে। কারণ হিসেবে তিনি ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেছিলেন যে তারা তখন হাজার হাজার মার্কিন সেনাকে জিম্মি করতে পারবেন এবং প্রতিটি জিম্মির মুক্তির বিনিময়ে এক বিলিয়ন ডলার করে ক্ষতিপূরণ আদায় করবেন। এছাড়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির পক্ষে তিনি কখনোই ছিলেন না এবং একে সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত মতামত বলে দাবি করেছিলেন। পরবর্তীতে জুনের মাঝামাঝিতে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যখন ১৭ জুন ইরান একটি আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে, তখনো রেজাই ওই চুক্তিতে বেশ কিছু ধোঁয়াশা ও অস্পষ্টতা রয়েছে বলে আপত্তি তোলেন এবং সেগুলো দ্রুত পরিষ্কার করার দাবি জানান। এর কিছুদিন পরেই ২৭ জুন তিনি হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করছে বলে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন। মোজতবা খামেনির সাথে তার এই ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ও রাজনৈতিক সখ্য নতুন এই উচ্চপদ পাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। গত রবিবার সর্বোচ্চ নেতা তাকে সরাসরি এসএনএসসিতে নিজের ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সময় তার সুদীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা এবং দেশের প্রতি অবদানের কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্মরণ করেন।

কিশোর বয়স থেকেই তৎকালীন শাহবিরোধী আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন মোহসেন রেজাই। ১৯৭৩ সালে সেসময়ের অত্যন্ত ক্ষমতাধর ও আতঙ্কজনক শাহের গোপন গোয়েন্দা সংস্থা ‘সাভাক’-এর হাতে গ্রেফতার হয়ে তাকে দীর্ঘদিন কারাবাসও করতে হয়েছিল। ১৯৭০-এর দশকের উত্তাল রাজনৈতিক সময়ে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা একটি সক্রিয় ও গোপন সশস্ত্র সংগঠন ‘মানসুরুন’-এর প্রতিষ্ঠা এবং এর সাংগঠনিক বিকাশে রেজাই অত্যন্ত অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ওই সংগঠনের যেসব সাহসী সদস্য সেসময় কারাবন্দি হয়েছিলেন, তাদের একটি বড় অংশই পরবর্তী সময়ে আইআরজিসির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। তবে তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের পাশাপাশি ইরান-ইরাক যুদ্ধের বেশ কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের ভেতরে বিতর্ক ও সমালোচনার মুখোমুখিও হতে হয়েছে তাকে। বিশেষ করে সেসময়ের কয়েকটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানে তার কমান্ডের ভূমিকা নিয়ে সমালোচকরা আজও প্রশ্ন তোলেন, যেগুলোতে বিপুলসংখ্যক সাধারণ ইরানি সেনার অমূল্য প্রাণহানি ঘটেছিল। এর মধ্যে ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরের আলোচিত ‘কারবালা-৪’ অভিযান অন্যতম, যার মূল লক্ষ্য ছিল যেকোনো মূল্যে ইরাকের কঠোর প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে কৌশলগতভাবে বসরার দিকে অগ্রসর হওয়া। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া একটি পোস্টে রেজাই সাফাই গেয়ে দাবি করেছিলেন যে শত্রুবাহিনীকে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত করার একটি নিখুঁত কৌশলগত উদ্দেশ্য নিয়েই মূলত কারবালা-৪ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল এবং এর ঠিক পরপরই মূল আক্রমণ হিসেবে কারবালা-৫ অভিযান চালানো হয়। কিন্তু তার এই ব্যাখ্যা প্রকাশের পর যুদ্ধফেরত সাবেক সেনা সদস্য, নিহত সেনাদের পরিবার এবং ইরানের বেশ কজন প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতার মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। এই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে পরবর্তীতে রেজাইকে আবার ব্যাখ্যা দিতে হয় যে কারবালা-৪ অভিযানটি সূচনায় সত্যিকার অর্থেই একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক আক্রমণ হিসেবেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তবে সেই অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পরই কেবল বাধ্য হয়ে সেটিকে পরবর্তী কারবালা-৫ অভিযানের আগে শত্রুকে ধোঁকা দেওয়ার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। তার এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য অতীতে দেশের ভেতরে সাবেক সেনা ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিলেও বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত প্রেক্ষাপটে তার এই কট্টর ও আপসহীন মানসিকতাই তাকে ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ চূড়ায় বসাতে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জ্বালানি তেলের দাম ১১৪ ডলার ছাড়াল | রুশ পেট্রোল রপ্তানি বন্ধ

1

হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত: ২৪ ঘণ্টায় ৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্

2

হরমুজে ওমানের অস্থায়ী নৌপথ চালু

3

রোনালদোকে কি মাঠ থেকে তোলার সময় হয়েছে?

4

বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে কেন আর্জেন্টিনায় ফিরে গেলেন না লিওনেল ম

5

ঢাকার খুব কাছেই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল: অশনি সংকেত?

6

বিয়ের খাবারে খাসির মাংস না দেওয়ায় সংঘর্ষ: আহত ১২

7

টাঙ্গাইলে টিউবওয়েলের পানি পান করে ৩২ শিক্ষার্থী অসুস্থ

8

কুয়েতের বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগারে ইরানের ধারাবাহিক হামলা, ব্

9

ইরানের পক্ষে যুদ্ধে জড়াতেন চীন-রাশিয়া-তুরস্ক: ট্রাম্পের দাবি

10

জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা: দুই যুদ্ধবিমান ধ্ব

11

জাতীয় সংসদে আয়াতের ভুল সংশোধন করলেন এমপি কামাল হোসেন

12

নেদারল্যান্ডসে ত্রিদেশীয় সিরিজের মাধ্যমে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের

13

চোট কাটিয়ে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ফিরছেন পারেদেস

14

বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনা করেই রেফারি হিসেবে অবসরে স্লাভকো ভি

15

কিশোরগঞ্জ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের মূল কর্মসূচি শুরু ১৬ আগস্ট

16

ব্রিস্টলের আকাশচুম্বী আবাসন প্রকল্পে ইসরাইলি অর্থায়ন: বিতর্ক

17

ঘরের কাজে পিছিয়ে জাপানি পুরুষরা

18

ফটিকছড়িতে সদর দপ্তর স্থানান্তরের দাবিতে টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল

19

শিক্ষা সচল রাখতে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মতামত নেবে সরকার: ববি হ

20