বিশ্ব রাজনীতিতে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় সম্প্রতি বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের উত্থান-পতন দেখা গেছে। গত সোমবারই মূল্যবান এই ধাতুর দাম বেড়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছিল। তবে সেই সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করার পরদিনই আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে আবারও পতন লক্ষ্য করা গেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ফেডারেল রিজার্ভের সুদের নীতিমালার প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই মূলত স্বর্ণের এই দরপতন ঘটেছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ড বা তাৎক্ষণিক বিক্রির জন্য স্বর্ণের দাম শূন্য দশমিক ছয় শতাংশ কমেছে। এই পতনের ফলে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ১৩৮ ডলার ৩২ সেন্টে নেমে আসে। ঠিক একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আগস্ট মাসে সরবরাহ করা স্বর্ণের ফিউচার বা আগাম চুক্তি মূল্য শূন্য দশমিক চার শতাংশ হ্রাস পেয়ে আউন্স প্রতি ৪ হাজার ১৪৯ ডলার ৯০ সেন্টে লেনদেন হতে দেখা গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন মূলত মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি নির্ধারণী বৈঠকের কার্যবিবরণীর দিকে গভীর নজর রাখছেন, যা থেকে আগামী দিনগুলোতে সুদের হারের ভবিষ্যৎ গতিপথ স্পষ্ট হবে।
এবিসি রিফাইনারির গ্লোবাল হেড অব ইনস্টিটিউショナル মার্কেটস নিকোলাস ফ্র্যাপেল এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন যে, গত সপ্তাহের ধারাবাহিকতায় স্বর্ণের বাজার বর্তমানে একটি শক্তিশালী সমর্থন স্তর বা সাপোর্ট লেভেল তৈরি করার চেষ্টা করছে। তবে স্বল্পমেয়াদে সুদের হার নিয়ে ফেডারেল রিজার্ভ আসলে কী ভাবছে, তা নিশ্চিত হতে সবাই তাদের পরবর্তী বার্তার অপেক্ষায় রয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে কেভিন ওয়ার্শের প্রথম বৈঠকে সুদের হার সমন্বয়ের বিষয়ে আগের মতো কোনো আগাম এবং নির্দিষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। চেয়ারম্যান ওয়ার্শের মতে, আগে থেকে কোনো কঠোর দিকনির্দেশনা দিয়ে রাখলে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের নমনীয়তা বা স্বাধীনতা কমে যেতে পারে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছিল। তবে সেই চূড়া স্পর্শ করার পর থেকে বিভিন্ন বৈশ্বিক কারণে ধাতুটির দাম ইতিমধ্যে ২৫ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে যে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে শক্তিশালী হতে থাকা মার্কিন ডলার এবং সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা স্বর্ণের মূল্যের ওপর এক ধরনের বড় চাপ তৈরি করেছে। এর মাঝে অবশ্য যুদ্ধবিরতির একটি চুক্তির সম্ভাবনায় মূল্যস্ফীতি নিয়ে তৈরি হওয়া ভয় কিছুটা প্রশমিত হয়েছিল। এর পাশাপাশি গত সপ্তাহে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার চেয়েও দুর্বল কর্মসংস্থান প্রতিবেদনটি বাজারে স্বল্পমেয়াদে সুদের হার বাড়ার আশঙ্কায় জল ঢেলে দেয়, যার ফলেই মূলত সোমবার স্বর্ণের দাম দুই সপ্তাহের সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠেছিল।
সিএমই ফেডওয়াচ টুলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মানি মার্কেটে সেপ্টেম্বর মাসে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা ধরা হচ্ছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। অথচ কর্মসংস্থানের সেই দুর্বল প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে এই সম্ভাবনা ৬০ শতাংশেরও বেশি ছিল। সাধারণ নিয়মে বাজারে সুদের হার কম থাকলে কোনো ধরনের সুদ বা লভ্যাংশ না দেওয়া সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ অনেক বেড়ে যায়। স্বর্ণের এই দরপতনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে অন্য মূল্যবান ধাতুগুলোর দামেও পরিবর্তন এসেছে। স্পট সিলভার বা রুপার দাম এক শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৬১ ডলার ৪৮ সেন্টে দাঁড়িয়েছে এবং প্লাটিনামের দাম শূন্য দশমিক এক শতাংশ হ্রাস পেয়ে আউন্স প্রতি ১ হাজার ৬২৯ ডলার ৪৬ সেন্টে নেমেছে। অন্যদিকে প্যালাডিয়ামের দাম কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে শূন্য দশমিক চার শতাংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ২৭২ ডলার ৮৫ সেন্টে পৌঁছেছে।
মন্তব্য করুন