ভারতে যৌতুক প্রথা ১৯৬১ সালেই আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবচিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, দেশটিতে যৌতুক-সংক্রান্ত নির্যাতন ও হত্যার সংখ্যা কমার বদলে বরং উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০২২ সালে ভারতে যৌতুকজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫১৬ জন, যা ১৯৮৮ সালের ১ হাজার ৮৪১ জনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। অথচ এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এখন আর আগের মতো জনমনে ক্ষোভ বা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে না, যা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের কিংস ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটের সামাজিক নৃবিজ্ঞানী ড. কৃতি কাপিলা তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, বিয়ের পর যৌতুকের দাবি পূরণ করতে না পারলে নারীরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাদের হত্যা করা হচ্ছে বা আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অতীতে যৌতুককে ‘সামাজিক উপহার’ হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে এটি বরের পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সামাজিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে বিশাল আর্থিক দাবিতে রূপ নিয়েছে। চাহিদামতো অর্থ না পেলে নববধূর ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ৭০ ও ৮০-এর দশকে যৌতুকবিরোধী শক্তিশালী নারী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, যা তৎকালীন সময়ে জনরোষের জন্ম দিত। কিন্তু বর্তমানে প্রতিবাদের পরিসর সংকুচিত হয়ে আসায় এই ধরনের সহিংসতাগুলো আর আগের মতো সংগঠিত আন্দোলনের রূপ নিতে পারছে না। হত্যার ধরন বদলে যাওয়ায় অনেক মৃত্যুকে এখন পারিবারিক ট্র্যাজেডি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যার ফলে জনআন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়েছে। এছাড়া যৌতুকের আর্থিক বোঝা এড়াতে কন্যাসন্তান জন্মের আগেই ভ্রূণ হত্যার মতো জঘন্য প্রবণতাও ভারতীয় সমাজে নারী-পুরুষের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
প্রশাসনের নীরবতা এবং সামগ্রিকভাবে সমাজ থেকে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর কমে যাওয়া এই সমস্যার সমাধানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষক ড. কৃতি কাপিলার মতে, যৌতুকজনিত সহিংসতা প্রতিদিন অসংখ্য নারীর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, কিন্তু তা আর রাজনীতির এজেন্ডায় উঠে আসছে না। এই নির্বাক পরিস্থিতিই প্রমাণ করে যে, আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মানসিকতা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সমাজ অনেক পিছিয়ে আছে। দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমেই কেবল এই মরণব্যাধি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
যৌতুক প্রথা নির্মূলে ভারতের প্রশাসনিক ও সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে আপনার মতামত জানান।
মন্তব্য করুন