অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে বাংলাদেশের নয় উইকেটের ঐতিহাসিক টেস্ট জয় ক্রিকেট বিশ্বে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের এই দুর্দান্ত ও অনুকরণীয় পারফরম্যান্সকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও বিস্ময়কর অঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছে। অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব সংবাদমাধ্যমে এই পরাজয়কে নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও হতাশা প্রকাশ করা হলেও, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের খ্যাতনামা সাবেক ক্রিকেটার ও ক্রিকেট বিশ্লেষকেরা টাইগারদের ভূয়সী প্রশংসায় ভাসিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য অস্ট্রেলিয়ান বাংলাদেশের কাছে অজিদের এই হারকে ‘গবস্ম্যাকিং শ্যাম্বলস’ বা চরম বিশৃঙ্খল ও বিস্ময়কর পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রতিবেদনটিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে এই পরাজয়কে সাধারণ কোনো হার হিসেবে দেখার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই; বরং এটি অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম বিব্রতকর পরাজয়গুলোর একটি। সাংবাদিক রবার্ট ক্র্যাডকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের বিপক্ষে এই ধাক্কা অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘ ২০ টেস্টের অভিযানের শুরুতেই এক বড় বিপত্তি ডেকে এনেছে। যদিও ক্যামেরন গ্রিনের দুর্দান্ত ও কাঙ্ক্ষিত প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি কিছুটা ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেছিল, তবুও তা ম্যাচের মোড় ঘোরাতে পারেনি। এছাড়া ম্যাচটির চমৎকার পিচেরও ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে।
ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের শক্তির ব্যবধান এতটাই প্রকট ছিল যে এটি একতরফা লড়াই হবে বলেই ধারণা করা হয়েছিল। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, অস্ট্রেলিয়া সর্বশেষ দুটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলেছে এবং নিজেদের আগের ২৩ টেস্টের ১৮টিতেই জয় তুলে নিয়েছিল। অন্যদিকে, এশিয়ার বাইরে বাংলাদেশ দল বরাবরই সংগ্রাম করেছে এবং তাদের সর্বশেষ ২৬ টেস্টের ২২টিতেই হেরেছিল। এমনকি অস্ট্রেলিয়ায় পা রাখার আগে জিম্বাবুয়ে ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষেও বড় ব্যবধানে হেরেছিল টাইগাররা। কিন্তু ডারউইনে এসে সব সমীকরণ উল্টে দিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণালী অধ্যায় রচনা করেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
অস্ট্রেলিয়ার অপর শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম হেরাল্ড সান তাদের শিরোনামে লিখেছে ‘ডিজাস্টার ইন ডারউইন’ বা ডারউইনে বিপর্যয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান আরও কঠোর ও সরাসরি ভাষায় অস্ট্রেলিয়ার এই পরাজয়কে ‘হতাশাজনক ও অপমানজনক’ বলে উল্লেখ করেছে। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ২৮৪ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান, যা মাত্র এক উইকেট হারিয়ে অত্যন্ত সহজে টপকে যায় সফরকারীরা। বিশেষ করে ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টাইগাররা যেভাবে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছিল, তা ক্রিকেট বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে। স্বনামধন্য ক্রীড়া মাধ্যম বিবিসি স্পোর্ট তাদের বিশ্লেষণে এটিকে টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই ঐতিহাসিক জয় নিয়ে প্রশংসার জোয়ার বইছে। ভারতের বিশিষ্ট রাজনীতিক ও ক্রিকেটপ্রেমী শশী থারুর এই জয়কে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের ‘গ্রেটেস্ট ভিক্টরি’ বা সর্বকালের সেরা জয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ভারতের প্রখ্যাত ক্রিকেট বিশ্লেষক হার্শা ভোগলে সরাসরি মন্তব্য করেছেন যে এটি ‘বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দিন।’ পাকিস্তানের কিংবদন্তি পেসার ওয়াসিম আকরামও বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্সের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, বিশেষ করে পেসার হাসান মাহমুদের লাইন-লেংথ ধরে রেখে বোলিং করার শৈলীর কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করেন। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার ড্যামিয়েন ফ্লেমিং এই জয়কে বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন যুগের সূচনা বলে মন্তব্য করেছেন।
ম্যাচে তানজিদ হাসানের নান্দনিক শতক, হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত পেস আক্রমণ এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণি জাদু সবমিলিয়ে ডারউইনের এই জয় ছিল একটি নিখুঁত ও সম্মিলিত দলের প্রচেষ্টার ফল। ম্যাচ শেষে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও অকপটে স্বীকার করেছেন যে এই জয়ের সম্পূর্ণ দাবিদার বাংলাদেশই। সবমিলিয়ে, ডারউইনের এই বিজয় প্রমাণ করে দিয়েছে যে বিদেশের মাটিতে বা বিশ্বসেরা দলগুলোর বিপক্ষেও বাংলাদেশ এখন টেস্ট ক্রিকেটে সমান তালে লড়াই করার পূর্ণ যোগ্যতা রাখে।
মন্তব্য করুন