মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান ও অত্যন্ত আগ্রাসী গুপ্তচরবৃত্তির আশঙ্কায় দেশটির বিরুদ্ধে কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স বা প্রতি-গোয়েন্দা হুমকির মাত্রা সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে শুক্রবার এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি বিশ্ববাসীর সামনে আনা হয়েছে। দুজন বর্তমান এবং একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই নতুন নিরাপত্তা মূল্যায়ন জারি করেছে। এর মাধ্যমে মার্কিন গোয়েন্দা নথিতে ইসরাইলের হুমকি সংক্রান্ত সূচকটিকে ‘ক্রিটিক্যাল’ বা সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ গোপন আলোচনা ও নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো আগেভাগে হাতানোর জন্যই ইসরাইল বর্তমানে ওয়াশিংটনে তাদের গোয়েন্দা তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পেন্টাগনের বর্তমান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, ডিআইএ-এর এই নতুন প্রতি-গোয়েন্দা মূল্যায়নে সাত পৃষ্ঠার একটি অতি-গোপন নথি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেখানে ইসরাইলি গোয়েন্দাদের এমন কিছু সুনির্দিষ্ট ও সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে যা ওয়াশিংটনের উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরান সংকট এবং লেবাননে চলমান ইসরাইলি সামরিক অভিযান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে সাম্প্রতিক তীব্র মতবিরোধের আবহেই এই উচ্চ সতর্কতা জারি করা হলো। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত সপ্তাহেই এই দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে অত্যন্ত উত্তপ্ত ও নজিরবিহীন এক ফোনালাপ হয়েছে। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে নাকি আলোচনার মাধ্যমে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাবে সে বিষয়ে নিখুঁত তথ্য পেতে চরম উদগ্রীব হয়ে আছে ইসরাইলি প্রশাসন।
অবশ্য ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরাইলি দূতাবাস এই মার্কিন প্রতিবেদনটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট দাবি করে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, ইসরাইল মার্কিন সরকারের কোনো কর্মকর্তার ওপর কোনো ধরনের গোয়েন্দা নজরদারি চালাচ্ছে না এবং এই ধরনের দাবি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও মিথ্যা। অন্যদিকে, পেন্টাগন এই স্পর্শকাতর বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদনটিকে অসত্য বলে উল্লেখ করেছেন। তবে দুই দেশের প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই ধরনের গোয়েন্দা নজরদারির আশঙ্কাকে মোটেও উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে বেশ গুরুত্বের সাথেই দেখছেন এবং মার্কিন প্রশাসনের এই উচ্চ সতর্কতার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক বিখ্যাত থিংক ট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এমিলি হার্ডিং ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থাকে ‘অতি-আগ্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট আসলে ভেতরে ভেতরে কী করতে যাচ্ছে, তা নিখুঁতভাবে জানার জন্য ইসরাইলিরা বরাবরই অত্যন্ত মাত্রায় আগ্রহী এবং সব সময়ই তৎপর থাকে। তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সির বরাত দিয়ে তৈরি এই সংবাদটি মার্কিন-ইসরাইল দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের ভেতরের এক গভীর ফাটল ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের চিত্রকে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে উন্মোচিত করল।