পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে অপরিবর্তনযোগ্য বা ইমিউটেবল ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগটিকে একটি বড় সংস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল লেনদেনের ডিজিটাল ট্রেইল তৈরি করা এবং তথ্যে যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। তবে নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এই প্রযুক্তি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় এখনো বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রযুক্তিগত এই রূপান্তরে দীর্ঘসূত্রতা, অসম্পূর্ণ ডেটা স্থানান্তর এবং স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিরাপত্তা কাঠামোকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অতীতের বড় বড় আত্মসাতের ঘটনার মূলে ছিল ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের সীমাবদ্ধতা। এই অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সব ব্রোকারেজ হাউসে আধুনিক ও অপরিবর্তনযোগ্য সফটওয়্যার ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান পুরনো ডাটাবেইস কিংবা ডুপ্লিকেট সিস্টেমের ওপর নির্ভর করছে। এমনকি সালতা ক্যাপিটালের মতো বড় কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন হলেও কার্যকর তদারকির অভাবে গ্রাহকের তথ্য পরিবর্তন করে অর্থ আত্মসাতের পথ এখনো খোলা রয়ে গেছে। সিডিবিএল সিস্টেমে গ্রাহকের মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তরের ঘটনাটি পুরো খাতের প্রযুক্তিগত দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ডিএসইর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২৮০টি ব্রোকারেজ হাউসে সফটওয়্যার স্থাপন করা হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান গ্রাহক তালিকার তথ্য ঠিকমতো স্থানান্তর করতে পারেনি এবং এখনো বহু হাউস দৈনিক পোর্টফোলিও বিবরণী পাঠাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারীরা তাদের অ্যাকাউন্টে কোনো অননুমোদিত পরিবর্তন হলে তা জানার সুযোগ পাচ্ছেন না। এছাড়া কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট (সিসিএ) সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে, যা গ্রাহকের অর্থের প্রকৃত অবস্থান যাচাই করা কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সফটওয়্যার ভেন্ডরের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, কারণ তাদের সিস্টেমে ডেটা মাইগ্রেশন ও নোটিফিকেশন ঘাটতি তুলনামূলক বেশি।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে শুধু আইন বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থাপনাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রযুক্তিগত সুরক্ষার অখণ্ডতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারকে কেবল নামকাওয়াস্তে চালু না করে এর মাধ্যমে স্বচ্ছ ও নির্ভুল ডেটাবেইস তৈরি করা সময়ের দাবি। সামপ্রতিক সময়ে সরকার পুঁজিবাজার উন্নয়নে কর-প্রণোদনা ও নতুন পণ্য চালুর মতো যেসব ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে, তা সফল করতে হলে বিনিয়োগকারীর সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সব ব্রোকারেজ হাউসকে একই ডিজিটাল মানদণ্ডে নিয়ে আসা এবং সফটওয়্যার বাস্তবায়নের অসম্পূর্ণ অধ্যায়টি দ্রুত শেষ করার মাধ্যমেই কেবল বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন করা সম্ভব। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং স্টক এক্সচেঞ্জগুলো যদি কঠোর তদারকি নিশ্চিত না করে, তবে প্রযুক্তিগত এই সংস্কার উদ্যোগটিও শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
মন্তব্য করুন