বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক পর্বতসম ঋণের বোঝার দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা গত এক শতাব্দীর মধ্যে দেখা যায়নি। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালের মধ্যেই বিশ্বের মোট সরকারি ঋণ বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শতভাগ ছুঁয়ে ফেলতে পারে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আয়োজিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার মঞ্চ থেকে আইএমএফের প্রকাশিত সর্বশেষ 'ফিসকাল মনিটর' প্রতিবেদনে এমন গুরুতর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী সরকারি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, চড়া সুদ পরিশোধের চাপ ও ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতির সংকট মোকাবিলায় প্রতিটি দেশকে অবিলম্বে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি।
আইএমএফের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ জিডিপির ৯৪ শতাংশে পৌঁছায় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানের নীতি অপরিবর্তিত থাকলে আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে তা ১০০ শতাংশে উন্নীত হওয়ার চরম ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মাত্রাতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ এবং সামাজিক সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত স্বনির্ভরতার খাতগুলোতে প্রতিনিয়ত সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়াকে এই পরিস্থিতির অন্যতম অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ঋণের বিপরীতে চড়া সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে দেশগুলোর সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মৌলিক অবকাঠামো ও দারিদ্র্য বিমোচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক খাতগুলোতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের সুযোগ হারাচ্ছে।
ঋণ ও সুদ পরিশোধের এই বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে নিম্ন আয়ের ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলো। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানান যে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মোট সংগৃহীত রাজস্বের একটি বড় অংশই এখন চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ মেটাতে। গত এক দশকে এসব দেশের রাজস্ব থেকে সুদ পরিশোধের ব্যয় ৬ শতাংশ থেকে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ১৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ক্রমান্বয়ে আকাশচুম্বী ও কঠিন হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দরিদ্র ও দুর্যোগকবলিত দেশগুলোর জন্য স্বল্প সুদে ঋণ এবং জরুরি আর্থিক সহায়তার তহবিল জোরদার করতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
কেবল উন্নয়নশীল বা স্বল্প আয়ের দেশগুলোই নয়, আইএমএফের এই সতর্কবার্তা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং চীনের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাজেট ঘাটতি কমানো এবং চীনা অর্থনীতিকে কেবল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল না রেখে অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়াতে নীতিগত সংস্কারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক এই ঋণ সংকট কাটাতে করব্যবস্থার আমূল সংস্কার, ভ্যাট ও করপোরেট করের অপব্যবহার বন্ধ এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় ছাঁটাই করে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করাই একমাত্র টেকসই পথ বলে মনে করে আইএমএফ।
মন্তব্য করুন