স্পেনের উত্তর আফ্রিকার ছিটমহল সেউতা সীমান্তে হঠাৎ করেই হাজার হাজার অভিবাসীর আকস্মিক ঢেউ এবং পরবর্তীতে তা নিয়ে ইউরোপজুড়ে সৃষ্টি হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের আলোড়ন তুলেছে। মরক্কো থেকে সাঁতরে বা ভেঙে পড়া সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় প্রবেশ করা এই বিপুল মানুষের ভিড় যেমন একটি বড় মানবিক ট্র্যাজেডির জন্ম দিয়েছে, তেমনি এটি উসকে দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ররোচনা ও বাস্তবচিত্র ঘটনার সূত্রপাত মূলত অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া কিছু বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা বার্তার মাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিছু অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয় যে ‘স্পেন সবার জন্য উন্মুক্ত’। তরুণদের উদ্দেশ্যে উস্কানিমূলক ভিডিও ও পোস্টে wetsuit এবং flippers পরে সাগরে লাফ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। অভিবাসীরা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, তারা সামাজিক মাধ্যমে এই ধরনের প্রলোভন দেখেই সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
তবে বাস্তবে এর কোনো ভিত্তি ছিল না। সেউতার তীরে পৌঁছানোর পর তারা কোনো ধরনের আশ্রয়, খাদ্য বা মূল ইউরোপে যাওয়ার পথ পাননি। ফলে হতাশ হয়ে বেশিরভাগ মানুষই ফিরে যেতে বাধ্য হন। এই মর্মান্তিক পদযাত্রা ও সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার সময় অন্তত ৬৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, যাদের মরদেহ ভেসে উঠেছে সাগরের বুক থেকে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই ঘটনার জন্য মানবপাচারকারী চক্রগুলোকে দায়ী করেছেন, যারা স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়কে বিকৃত করে অপপ্রচার চালিয়েছিল। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, সাগরে আটক অনিয়মিত অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না—যা পাচারকারীরা সুযোগ হিসেবে নেয়।
ইউরোপীয় রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও বিভাজন এই ঘটনা ইউরোপের রাজনীতিতে গভীর রেখাপাত করেছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে জানিয়েছেন যে, তারা সংকটে সহযোগিতা না করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে।
বিশেষ করে ইতালি এই সুযোগটি বেশ জোরালোভাবে কাজে লাগিয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জি মেলোনির ডানপন্থী দল সামাজিক মাধ্যমে সেউতার ছবি ব্যবহার করে স্পেনের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করে। পরবর্তীতে মেলোনি নিরাপত্তা হুমকির কারণ দেখিয়ে ইতালির সঙ্গে স্পেনের ‘শেনজেন চুক্তি’ সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেন। যদিও সেউতা শেনজেন এলাকার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং সেখান থেকে অভিবাসীদের মূল ইউরোপে যাওয়ার কোনো আইনি সুযোগ ছিল না, তবুও আগামী বছরের নির্বাচনকে সামনে রেখে কড়া বার্তা দিতে মেলোনি এই পদক্ষেপ নেন। একই সঙ্গে ফ্রান্সও স্পেনের সঙ্গে তার সীমান্তে নথিপত্র পরীক্ষা কড়াকড়ি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকেও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এসেছে। ইরান সংঘাতের বিরোধিতা করায় স্পেনের ওপর ক্ষুব্ধ থাকা মার্কিন প্রশাসন এই পরিস্থিতিকে 'বিপর্যয়' ও 'আক্রমণ' হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মহলে রাশিয়াও এই সুযোগে ইউরোপের ভেতরকার ভাঙন ও বিশৃঙ্খলা নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আগামী দিনের পদক্ষেপ বর্তমানে স্পেন সেউতা সীমান্তে সুরক্ষা জোরদার করতে সমুদ্রের দিকে কাঁটাতারের বেড়া ও বয়া বসানোর কাজ শুরু করেছে। আগামী সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা আরও কঠোর করার বিষয়টি প্রধান এজেন্ডা হিসেবে থাকবে। তবে এই ভূরাজনৈতিক ও সোশ্যাল মিডিয়ার অপপ্রচারের লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সেই তরুণদের, যারা অনলাইনে দেখা একটি অলীক স্বপ্নের পেছনে ছুটে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছেন।
মন্তব্য করুন