করোনাভাইরাস মহামারির জরুরি সময়ে সংক্রমণ প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও ব্যস্ত জনবহুল মোড়ে মোড়ে হাত ধোয়ার যে অভিনব অবকাঠামো ও স্টেশন গড়ে তোলা হয়েছিল, তা আজ পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে। সে সময় সাবান-পানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হলেও আজ সেই উদ্যোগগুলোর প্রায় সবই হারিয়ে গেছে। বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসের প্রাক্কালে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যে উঠে এসেছে যে, করোনাকালের সেই জরুরি ব্যবস্থাগুলো দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ায় বর্তমানে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
মহামারির দিনগুলোতে ঢাকা ওয়াসা ও বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে রাজধানীর বাংলামোটর, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পানির ট্যাংক ও হাত ধোয়ার বেসিন বসানো হয়েছিল। এমনকি ‘হ্যান্ড ওয়াশিং অন হুইলস’ কর্মসূচির মাধ্যমে ভ্যানে করেও পানি সরবরাহ করা হতো। তবে সময়ের ব্যবধানে রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাবে সেগুলোর বেশিরভাগই এখন উধাও হয়ে গেছে। যে দু-একটি জায়গায় বেসিন বা ট্যাংক অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলোতে পানি কিংবা সাবানের কোনো বালাই নেই; বরং ময়লার আবর্জনা জমে সেগুলো এখন ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
এদিকে রাজধানীসহ দেশের বড় বড় সরকারি হাসপাতালের ভেতরের চিত্র আরও বেশি উদ্বেগজনক। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো জনবহুল চিকিৎসালয়গুলোর ওয়াশরুম ও টয়লেটগুলোর পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। ফ্লাশ নষ্ট থাকা, সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ না থাকা এবং পানির অপর্যাপ্ততার কারণে কিডনি ও ইউরোলজির মতো জটিল রোগীদের দীর্ঘ সময় এসব স্থানে গিয়ে চরম মানবেতর পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে। অনেক রোগী ও তাদের স্বজনদের বাধ্য হয়ে হাসপাতালের বাইরে গিয়ে বিকল্প খুঁজতে দেখা যায়, যা একটি চিকিৎসা কেন্দ্রের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান।
হাসপাতালের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও বেশ শোচনীয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, দেশের মাত্র ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার মৌলিক সেবা রয়েছে, যার অর্থ দাঁড়ায় প্রায় অর্ধেক স্কুলেই এই মৌলিক সুবিধাটির ঘাটতি রয়েছে। তাছাড়া মাত্র ১১ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়াশ বা স্বাস্থ্যবিধি খাতে নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ রয়েছে। নিয়মিত তদারকি ও ছোটখাটো মেরামতের জন্য ফান্ডের অভাব থাকায় সামান্য ট্যাপ বা পাইপ নষ্ট হলেও তা দীর্ঘকাল অকেজো পড়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবান দিয়ে সঠিকভাবে হাত ধোয়া ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি অন্তত ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু শুধু এক দিনের দিবসকেন্দ্রিক আলোচনা বা প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে হাত ধোয়ার স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ, নিরবচ্ছিন্ন সাবান-পানি সরবরাহ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। করোনা মহামারি আমাদের যে শিক্ষা দিয়ে গেছে, তাকে কেবল জরুরি সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
মন্তব্য করুন