ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ ১২ বছরের শাসনামলে কেন্দ্রীয় কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগ ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রসমাজের তীব্র আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না দেশের তরুণরা। তাদের কাছে এটি গণআন্দোলনের শক্তি এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক ঐতিহাসিক বিজয়। বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই আন্দোলনের নেপথ্য গল্প এবং ভারতের নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের চিত্র।
চলতি বছরের মে মাসে ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নফাঁস দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এই মানসিক চাপ ও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে, যা তরুণদের রাজপথে নামতে বাধ্য করে। শুরুতে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই অসন্তোষ পরবর্তীতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশব্যাপী ছাত্র-আন্দোলনে রূপ নেয়।
এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল এর ডিজিটাল রূপায়ণ। প্রচলিত গণমাধ্যমের পরিবর্তে ইনস্টাগ্রাম রিলস, মিম এবং ছোট ভিডিওর মাধ্যমে মুহূর্তেই লাখো তরুণকে একত্রিত করা হয়। পুলিশি লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তার এবং দমন-পীড়নের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়লে জনমত সম্পূর্ণভাবে শিক্ষার্থীদের পক্ষে চলে যায়। বিশেষ করে ১৮ ও ২০ জুলাইয়ের বিক্ষোভে পুলিশের টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জের ঘটনা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষোভের শিকড় কেবল একটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার বেসরকারিকরণ, শিক্ষার লাগামহীন ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং গভীর সামাজিক বৈষম্য। সরকারি তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষা শেষ করেও ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের সিংহভাগই স্থায়ী বা সম্মানজনক চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার শিকার তরুণ প্রজন্ম এবার পুলিশি জুজু ও দমন-পীড়নের ভয় ভেঙে রাস্তায় নেমে এসেছে।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর বিক্ষোভস্থলগুলোতে এখন নতুন স্লোগান উচ্চারিত হচ্ছে ‘প্রধান কেবল শুরু, এবার মোদীর পালা।’ আন্দোলনকারীরা মনে করছেন, এই গণআন্দোলন শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে থেমে থাকবে না; বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে এটি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলবে। যদিও শতাধিক আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের মতো আইনি হয়রানির শঙ্কা রয়ে গেছে, তবুও তরুণদের বিশ্বাস একবার নিজের কণ্ঠের শক্তি টের পাওয়ার পর এই প্রজন্মকে আর সহজে নীরব করে রাখা যাবে না।
মন্তব্য করুন