মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা আরও জোরদার করার পাশাপাশি সংঘাত বিস্তারের হুমকি প্রদান করেছে। ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব হ্রাস করা এবং তেহরানকে নতুন করে শর্তসাপেক্ষে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অতীতেও যে সামরিক কৌশল তেহরানকে নতি স্বীকার করাতে ব্যর্থ হয়েছে, এবারও তার সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ।
গত এক মাস আগে সম্পাদিত একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়নি, তবে সংকট সমাধানের পথ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে; আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আর্থিক খাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। প্রতিশোধমূলক হামলার ধারাবাহিকতায় ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের হামলা তাদের বিদ্যুৎ অবকাঠামো বা অন্যান্য কৌশলগত স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করে, তবে ইয়েমেনের হুথি মিত্রদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা হতে পারে, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
মার্কিন প্রশাসনের অন্দরেও ইরানের জ্বালানি স্থাপনা, খার্গ দ্বীপের তেল রপ্তানি কেন্দ্র এবং গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক জনাথন প্যানিকফের মতো বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ ইরানের অবস্থান পরিবর্তনের পরিবর্তে তাদের আরও কঠোর অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করেছেন যে, ইরান কেবল সামরিক শক্তির ভাষাই বোঝে, তাই তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।
দেশের ভেতরেও ট্রাম্পকে বেশ চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে সম্ভাব্য প্রাণহানি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ওপর এই পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। একদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা স্থবির, অন্যদিকে নৌপথে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও বন্দর অবরোধের মতো পদক্ষেপগুলো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক ড্যানি সিত্রিনোভিচের মতে, চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে সহজে নতি স্বীকার করানো সম্ভব নয়; বরং হামলা বিস্তৃত হলে তেহরান পাল্টা জবাব আরও জোরালো করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের এই কৌশলগত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের একটি নতুন অধ্যায় সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।