আসন্ন বহুল প্রতীক্ষিত ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে ফুটবল দুনিয়ায় নিজেদের ঐতিহ্যকে নতুন করে চেনাতে এবং বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য ইতিহাস গড়তে ‘মেক্সিকান ওয়েভ’-এর নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়ার এক সাড়াজাগানো উদ্যোগ নিয়েছে মেক্সিকো সিটি। শনিবার সকালে মেক্সিকোর রাজধানী সিটির অন্যতম প্রধান ও ঐতিহাসিক সড়ক পাসেও দে লা রেফর্মায় হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জড়ো হয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবঢেউ বা ‘মেক্সিকান ওয়েভ’ তৈরির এক অবিস্মরণীয় চেষ্টা করেন। এই বর্ণিল ও চোখধাঁধানো আয়োজনের মাধ্যমে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে গ্যালারিতে বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠা বিখ্যাত ‘মেক্সিকান ওয়েভ’-এর ৪০ বছর পূর্তিও বেশ রাজকীয়ভাবে উদযাপন করা হয়। যদিও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এই দর্শক উদ্দীপনার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের প্রকৃত উৎপত্তি নিয়ে বেশ কিছু বিতর্ক রয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পুরোনো ক্রীড়া ভেন্যুও এর প্রাথমিক রূপের দাবিদার, তবে মেক্সিকোর ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে এর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
আগামী ১১ জুন থেকে উত্তর আমেরিকা মহাদেশে যৌথভাবে শুরু হতে যাওয়া মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সমন্বয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ আয়োজক দেশ হিসেবে ফুটবল বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মেক্সিকো। এই মেগা টুর্নামেন্টটি সফলভাবে আয়োজনের মধ্য দিয়ে মেক্সিকো ফুটবল ইতিহাসে প্রথম দেশ হিসেবে তৃতীয়বারের মতো পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্বকাপ একক কিংবা সহ-আয়োজনের এক অনন্য ও কীর্তিময় মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে। এর আগে ফুটবলপাগল এই লাতিন আমেরিকান দেশটি যথাক্রমে ১৯৭০ সালের পেলে-যুগ এবং ১৯৮৬ সালের ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরী বিশ্বকাপের সফল ও সার্থক আয়োজন করে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে এক চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের নতুন ফুটবল উৎসবের জোয়ারে ভাসতে এখন পুরোপুরি প্রস্তুত মেক্সিকোর সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে দেশের ফুটবল প্রশাসন।
শনিবারের এই ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়ার মহোৎসবে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র দিয়ে বয়ে যাওয়া পাসেও দে লা রেফর্মায় স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দা ও বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটকদের এক অভূতপূর্ব দীর্ঘ ও সুশৃঙ্খল সারি চোখ পড়ে। উপস্থিত ফুটবল অনুরাগীদের অনেকেই মেক্সিকো জাতীয় ফুটবল দলের ঐতিহ্যবাহী সবুজ রঙের জার্সি গায়ে জড়িয়ে এবং হাতে লাল-সবুজ-সাদা জাতীয় পতাকা নিয়ে অত্যন্ত আবেগভরে ‘মেক্সিকো, মেক্সিকো’ স্লোগানে পুরো রাজপথ মুখরিত করে তোলেন। এরপর সবাই মিলে অত্যন্ত নিখুঁত ও সমন্বিতভাবে হাত উঁচিয়ে একের পর এক ঢেউয়ের মতো চমৎকার এক দৃশ্য তৈরি করেন, যা মুহূর্তের মধ্যে পুরো বিশালাকার জনসমাগমের মধ্যে এক অবিশ্বাস্য ও নয়নাভিরাম মানবঢেউয়ে রূপ নেয়। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ‘মেক্সিকান ওয়েভ’ সংক্রান্ত কয়েকটি আলাদা বিভাগকে অফিশিয়ালি স্বীকৃতি দিয়েছে, যার মধ্যে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বড় ওয়েভটি হয়েছিল ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৪ জন মানুষ অংশ নিয়েছিলেন এবং সময়ের হিসেবে দীর্ঘতম ওয়েভটি ২০১৫ সালে জাপানে একটানা ১৭ মিনিট ১৪ সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছিল।
মেক্সিকো সিটি সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা মুখপাত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানান যে, তাদের মূল লক্ষ্য প্রথাগত স্টেডিয়ামের গণ্ডি পেরিয়ে ওপেন স্ট্রিট বা স্টেডিয়ামের বাইরে উন্মুক্ত স্থানে অনুষ্ঠিত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘মেক্সিকান ওয়েভ’-এর এক সম্পূর্ণ নতুন ও অনন্য রেকর্ড গড়া। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে এটি কোনো বিদ্যমান রেকর্ড ভাঙার সস্তা প্রতিযোগিতা নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন একটি ক্যাটাগরিতে রেকর্ড স্থাপনের এক আন্তরিক চেষ্টা, যার ফলে গিনেস কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই অনুষ্ঠানস্থল থেকে সব তথ্য-প্রমাণ ও ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন এবং তারা রেকর্ডটি অনুমোদনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘জিও নিউজ’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই উৎসবমুখর পরিবেশে শামিল হতে পেরে দূর থেকে আসা মেক্সিকান নাগরিক তেরেসা লোপেজ এবং বিশ্বকাপ উপলক্ষে মেক্সিকো সিটিতে আসা বিদেশি পর্যটক ভিভিয়া শাইভার্স অত্যন্ত আনন্দ ও গর্ব প্রকাশ করেছেন, যা প্রমাণ করে এই বিশ্বকাপ কেবল মাঠের খেলাই নয়, বরং তা সংস্কৃতির এক মিলনমেলা।