দেশজুড়ে মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশু মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই থামছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক সর্বশেষ নিয়মিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, হামের বিভিন্ন তীব্র উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা থেকে আজ রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে আরও সাতটি নিষ্পাপ শিশুর অকাল মৃত্যু হয়েছে। এই একই সময়ের মধ্যে সারা দেশে নতুন করে হাম এবং হামের নানা উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন আরও এক হাজার ২৮৭ জন সাধারণ মানুষ। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হামের তীব্র উপসর্গ দেখা দিয়েছে দেশের এক হাজার ২২১ জন শিশুর শরীরে এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি হাম শনাক্ত বা আক্রান্ত হয়েছে আরও ৬৬টি শিশু। হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়ায় দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
আজ রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ সেল থেকে প্রকাশিত হামবিষয়ক দৈনিক প্রতিবেদনে দেশের এই উদ্বেগজনক ও সংবেদনশীল স্বাস্থ্য পরিস্থিতির সার্বিক পরিসংখ্যান বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে মারা যাওয়া সাত শিশুর মধ্যে সর্বোচ্চ চারজনই রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। এছাড়া ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম বিভাগে একজন, ময়মনসিংহ বিভাগে একজন এবং খুলনা বিভাগে আরও একজন শিশু এই ভাইরাসের তীব্র সংক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত শিশুদের পুষ্টিহীনতা, যথাসময়ে হামের বুস্টার ডোজ বা টিকা না নেওয়া এবং সচেতনতার অভাবের কারণেই ঢাকাসহ দেশের প্রধান বিভাগীয় শহরগুলোতে এই রোগের প্রকোপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
সরকারি এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত হামের তীব্র উপসর্গে দেশে মোট ৫২৯টি শিশুর মৃত্যুর ভয়াবহ তথ্য সরকারি নথিতে রেকর্ড করা হয়েছে। ঠিক একই সময়ে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে হাম রোগ শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে আরও ৯১টি শিশু। সব মিলিয়ে গত আড়াই মাসে দেশে হাম এবং হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২০ জনে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতিমধ্যেই দেশের ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুততম সময়ে আইসোলেশনে রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামগ্রিক তথ্য-উপাত্ত আরও বলছে যে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত দেশজুড়ে মোট ৭৯ হাজার ১২ জন শিশুর শরীরে হামের প্রাথমিক বা তীব্র উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রচণ্ড জ্বর ও র্যাশের মতন হামের মারাত্মক উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হয়েছে ৬৪ হাজার ২৬৩টি শিশু। তবে আশার কথা হলো, হাসপাতালে সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যা পাওয়ার পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ইতিমধ্যেই ৬০ হাজার ৮৪টি শিশু নিরাপদে তাদের নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে সক্ষম হয়েছে। তবে বর্তমানেও হাজার হাজার শিশু দেশের বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় মা ও শিশুদের সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও মাঠপর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন