ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এল দোরা শিশু হাসপাতালের ঠিক আশপাশের এলাকায় হঠাৎ করেই ট্যাংক এবং অত্যাধুনিক কোয়াডকপ্টার ড্রোন থেকে অতর্কিত গুলিবর্ষণ করেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। অবরুদ্ধ এই উপত্যকার স্থানীয় বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই উদ্বেগজনক তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, চিকিৎসারত নিষ্পাপ শিশুদের এই বিশেষ হাসপাতালটির চারপাশ ঘিরে হঠাৎ করেই ভারী অস্ত্র ও গোলার বিকট শব্দ শুরু হয়। কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই ঘনবসতিপূর্ণ এই হাসপাতালের নিকটবর্তী এলাকায় শুরু হওয়া এই গোলাগুলির ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে পুরো হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ও সংলগ্ন রাস্তায় চরম আতঙ্ক ও হাহাকার সৃষ্টি হয়।
নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে এল দোরা শিশু হাসপাতালটি এমন একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অবস্থিত, যাকে দখলদার ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বেশ কিছুদিন আগে ‘ইয়েলো জোন’ বা ‘হলুদ অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে। স্থানীয় বিভিন্ন বেসামরিক সূত্র ও সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের বিশেষ রঙে চিহ্নিত অঞ্চলগুলো সাধারণত ইসরাইলি বাহিনীর সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য পূর্বনির্ধারিত থাকে অথবা সেসব এলাকায় ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষের স্বাধীনভাবে চলাচলের ওপর কঠোর ও অমানবিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। চিকিৎসা কেন্দ্রের মতন একটি সুরক্ষিত ও আন্তর্জাতিকভাবে মানবিক স্পর্শকাতর স্থাপনার এত কাছে এই ধরনের সামরিক তৎপরতা আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের শামিল বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
হামলার ঘটনার সময় এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে যে, হাসপাতালের ভেতরে সরাসরি কোনো গোলা আঘাত না করায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ধরনের বড় ক্ষয়ক্ষতি বা কোনো ফিলিস্তিনির হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে হাসপাতালের একদম সন্নিকটে এমন ভয়াবহ ও অনবরত গোলাগুলির শব্দের কারণে ভেতরে চিকিৎসাধীন থাকা গুরুতর অসুস্থ শিশু রোগী, তাদের উদ্বিগ্ন স্বজন এবং জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করা চিকিৎসাকর্মীদের মধ্যে চরম মানসিক ট্রমা ও গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এমনিতেই গাজার চিকিৎসা ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে, তার ওপর হাসপাতালের বাইরে এমন যুদ্ধাবস্থা তৈরি হলে জরুরি সেবা সচল রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
চলমান হামাস-ইসরাইল যুদ্ধের এই দীর্ঘ মেয়াদে গাজার স্বাস্থ্য অবকাঠামোগুলোকে বারবার টার্গেট করার যে অভিযোগ ইসরাইলের বিরুদ্ধে রয়েছে, এই ঘটনাটি তারই ধারাবাহিকতার অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র নিন্দা ও যুদ্ধবিরতির আহ্বান সত্ত্বেও গাজার হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না, যা প্রতিনিয়ত সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জীবনকে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বনেতাদের আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি সাধারণ ফিলিস্তিনিদের, যাতে অন্তত চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে মুক্ত থাকতে পারে।