দেশে আশঙ্কাজনক হারে ক্রমবর্ধমান শিশু নির্যাতন মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স গঠনের জোর আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শিশু নির্যাতন বর্তমান সমাজের একটি গুরুতর ও জঘন্য সামাজিক ব্যাধি, যা কেবল সনাতন আইনি বা পুলিশি প্রয়োগের মাধ্যমে চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব নয়। এই ভয়াবহ মানবিক সংকট মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রের সর্বস্তরের অংশীজনকে সম্পূর্ণ সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শনিবার রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক বিশেষ গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি তুলে ধরেন। ‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেল’ এই সময়োপযোগী আলোচনার আয়োজন করেছিল।
ডেপুটি স্পিকার তার বক্তব্যে শিশুদের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে চরম দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, শিশু নির্যাতনের মূল সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো গভীরভাবে চিহ্নিত করে আমাদের বিদ্যমান আইন, রাষ্ট্রীয় নীতি এবং সুরক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে থাকা প্রশাসনিক ঘাটতিগুলো দ্রুত মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক, বৈষম্যহীন ও সহিংসতামুক্ত সমাজ গঠনে কার্যকর ও টেকসই কৌশল প্রণয়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিজ্ঞিলিক ও নৈতিক দায়িত্বের অংশ। সম্প্রতি পল্লবীতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া আট বছরের শিশু রামিসা হত্যার বিচার প্রসঙ্গে তিনি ভুক্তভোগী পরিবারকে আশ্বস্ত করে বলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে এই জঘন্য অপরাধের ন্যায়বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে এবং সরকার ফাঁকা কথার চেয়ে বাস্তব কাজে বেশি বিশ্বাসী।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিশুদের প্রতি কেবল শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনই বাড়ছে না, বরং অনলাইনভিত্তিক নানা সাইবার অপরাধ ও নির্যাতনের ঝুঁকিও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে সন্তানদের সুরক্ষায় অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা, প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং শিশুদের অধিকার সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তিনি আরও বলেন, নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের আইনি, চিকিৎসা এবং মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে যেসব প্রতিষ্ঠান দিনরাত সহায়তা প্রদান করছে, তারা মূলত অত্যন্ত মহৎ ও মানবিক দায়িত্ব পালন করছেন। এসব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নিখুঁত কার্যক্রম নির্যাতিত অসহায় মানুষদের দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এবং স্বাভাবিক সুন্দর জীবনে ফিরে আসার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী প্রফেসর ড. মো. রফিকুল ইসলামের অত্যন্ত দক্ষ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই গোলটেবিল বৈঠকে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, দেশের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক, প্রবীণ সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, আইনজীবী, বরেণ্য শিল্পী এবং মানবাধিকার কর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। এ সময় উপস্থিত বক্তারা শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে অবিলম্বে কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এমপি, নিপুণ রায় চৌধুরী এমপি, প্রখ্যাত প্রবীণ অভিনেতা আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল, নিহত রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লাসহ নারী ও শিশু অধিকার বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত হয়ে এই মানবিক লড়াইয়ে একাত্মতা প্রকাশ করেন।