ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লালকেল্লার প্রাঙ্গণ থেকে জাতির উদ্দেশে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছেন। এই ভাষণে তিনি দেশের তরুণ সমাজের দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক শিক্ষা, খেলাধুলা, বেসামরিক প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন এবং পারমাণবিক জ্বালানি খাতকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি বড় ঘোষণা প্রদান করেছেন। চলুন একনজরে দেখে নেওয়া যাক মোদির এই ঘোষণাসমূহের বিস্তারিত।
১ কোটি তরুণকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রশিক্ষণ দেশের তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যতের প্রযুক্তির জন্য প্রস্তুত করতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ১ কোটি তরুণকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) বিষয়ের ওপর বিশেষ দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেবে সরকার। এর মূল লক্ষ্য হলো—ভারতের তরুণরা যেন আগামী দিনে বিশ্বব্যাপী এআই খাতের নেতৃত্ব দেওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বিনামূল্যে অনলাইন কোচিং দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বড় স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে এই নতুন ঘোষণা। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে কোচিংয়ের চড়া মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে পরিবারগুলোর ওপর যে বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি হয়, তা কমাতে সরকার এবার ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষ শিক্ষকদের সহায়তায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অনলাইন কোচিং চালুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর ফলে অভিভাবকদের আর্থিক দুশ্চিন্তা যেমন কমবে, তেমনই শিক্ষার্থীরা কোনো বাধা ছাড়াই নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাবে।
আধুনিক বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী বর্তমান যুগের পরিবর্তিত নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিভিন্ন জরুরি সংকট মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী ও আধুনিক বেসামরিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। আধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ এবং উন্নত ব্যবস্থার সঙ্গে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করে একটি বিশাল আধুনিক বেসামরিক প্রতিরক্ষা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, যা যেকোনো সমসাময়িক সংকট দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত থাকবে।
শিশুদের জন্য দেশব্যাপী ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ খেলাধুলায় ভারতকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সি শিশুদের নিয়ে দেশব্যাপী একটি বিশাল প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ২০৩৬ সালের অলিম্পিকে দেশের অন্তত তিন-চতুর্থাংশ ইভেন্টে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বড় লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে ভারত। নতুন এই কর্মসূচির আওতায় দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে সম্ভাবনাময় শিশু অ্যাথলেটদের খুঁজে বের করে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশ্বমানের খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালে কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের ইচ্ছার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে মাইক্রোচিপ বা সেমিকন্ডাক্টরের গুরুত্ব অপরিসীম। ইলেকট্রনিক্স পণ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে শুরু করে আধুনিক পরিবহণ ব্যবস্থায় চিপ অপরিহার্য হওয়ায় ভারত এখন এই খাতে স্বনির্ভর হওয়ার পথে রয়েছে। ইতিমধ্যে দেশটিতে তিনটি বড় সেমিকন্ডাক্টর কারখানা স্থাপন করা হয়েছে এবং সেগুলোর উৎপাদনও শুরু হয়েছে। আগামী ৭ থেকে ৮ বছরের মধ্যে আরও ৫ থেকে ৮টি নতুন সেমিকন্ডাক্টর কারখানা চালু হওয়ার কথা রয়েছে, যা ভারতকে প্রযুক্তিগত দিক থেকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নেবে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন মোদি। ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। পাশাপাশি, চলতি দশকের মধ্যেই পাঁচটি নতুন পারমাণবিক চুল্লি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দ্রুত প্রজননশীল পারমাণবিক চুল্লি প্রযুক্তিতে ভারত এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা ভবিষ্যতে পারমাণবিক জ্বালানির ক্ষেত্রে দেশের স্বনির্ভরতাকে আরও বেশি সুদৃঢ় করবে।
মন্তব্য করুন