গ্রামবাংলা মানেই বিকালের নরম আলোয় ধুলোমাখা মাঠে খালি পায়ে ছুটে চলা একুশে কিশোরের ফুটবল কিংবা ক্রিকেট খেলার দুরন্ত শৈশব। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণ, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন এবং অপরিকল্পিত দালানকোঠার ভিড়ে হারিয়ে গেছে মাঠগুলো। শিশু-কিশোরদের খেলার সেই চিরচেনা পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক সুদূরপ্রসারী বিপ্লব ঘটাতে এবার বিশাল অবকাঠামোগত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা ও বিভাগ—সর্বস্তরে খেলাধুলার সুযোগ তৈরিতে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রীড়ার সামগ্রিক মানচিত্র।
এই পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গ্রামবাংলা। দেশের ৪ হাজার ৫ শতাধিক ইউনিয়ন পরিষদে অন্তত ৪ থেকে ৮ বিঘা জমির ওপর একটি করে আধুনিক উন্মুক্ত খেলার মাঠ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যাতে কোনো শিশুই শুধু খেলার জায়গার অভাবে তার শৈশব না হারায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় ইতোমধ্যে মাঠ চিহ্নিতকরণের কাজ শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক তার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে মাঠ নিশ্চিত করা হবে এবং রাজধানীকেন্দ্রিক ক্রীড়া ব্যবস্থাকে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হবে।
শুধু ইউনিয়ন পর্যায় নয়, দেশের ১০টি জেলায় প্রায় ৭ একর জায়গা জুড়ে আন্তর্জাতিক মানের ‘স্পোর্টস ভিলেজ’ বা ক্রীড়া কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে থাকবে আধুনিক স্টেডিয়াম, ইনডোর এরিনা, সাঁতার কাটার সুবিধা, শুটিং, আর্চারি এবং জিমনেসিয়ামের সুব্যবস্থা। এর মাধ্যমে জেলা পর্যায়েই বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পাবে উদীয়মান অ্যাথলেটরা। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে ‘শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম’ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। প্রথম ধাপে ১২৫টি এবং দ্বিতীয় ধাপে আরও ২০১টি উপজেলায় এই স্টেডিয়ামগুলোর কাজ চলমান রয়েছে, যা স্থানীয় ক্রীড়াবিদদের নিয়মিত অনুশীলন ও প্রতিভা বিকাশের মূল কেন্দ্রে পরিণত হবে।
অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির মাধ্যমে সারা দেশ থেকে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সি প্রতিভাবান কিশোর-কিশোরীদের খুঁজে এনে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অতীতে বহু কৃতি খেলোয়াড় সুযোগ ও পরিচর্যার অভাবে হারিয়ে গেলেও বর্তমান এই বহুমুখী পদক্ষেপের ফলে সেই দৃশ্যপট পাল্টে যেতে শুরু করেছে। ইউনিয়নের মাঠ, উপজেলা মিনি স্টেডিয়াম, জেলা স্টেডিয়াম এবং প্রস্তাবিত স্পোর্টস ভিলেজের এই চার স্তরের কাঠামোর সঙ্গে যদি নিয়মিত কোচিং, পুষ্টি ও উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ যুক্ত হয়, তবে বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হবে নিশ্চিতভাবেই।
একটি মাঠ কেবল কিছু সবুজ ঘাস কিংবা সীমানারেখা নয়; একটি মাঠ মানেই বিকালের আলোয় নতুন কোনো স্বপ্নের জন্ম নেওয়া। মোবাইল স্ক্রিনের বন্দিদশা থেকে শিশুদের মুক্ত করে খেলার মাঠে ফিরিয়ে আনার এই মহতী উদ্যোগ সফল হলে, অদূর ভবিষ্যতে গ্রামের ওই ধুলোমাখা মাঠ থেকেই উঠে আসবে বাংলাদেশের পরবর্তী অলিম্পিয়ান, এশিয়ান গেমস পদকজয়ী কিংবা বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা উড়ানো কোনো নতুন মহাতারকা।
মন্তব্য করুন