অবসরকালীন সুবিধার টাকা তুলতে গিয়ে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও হয়রানির এবার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। নির্বাচিত বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালে শিক্ষকদের আর অফিসে অফিসে ধর্না দিতে হবে না বলে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, কোনো প্রকার ভোগান্তি ও মধ্যস্বত্বভোগীর হয়রানি ছাড়াই এখন থেকে শিক্ষকদের প্রাপ্য টাকা যথাসময়ে অনলাইনে সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়া হবে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এই যুগান্তকারী ঘোষণা দেন। এই ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ২০২২ সালের পর অর্থাৎ দীর্ঘ চার বছর পর তাদের জমানো ফান্ডের একটি বড় অংশ ফেরত পেয়েছেন। 'বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট' এবং 'অবসর সুবিধা বোর্ড' থেকে এই অর্থ সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে, যা শিক্ষকদের জীবনের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও হতাশার অবসান ঘটিয়েছে।
শিক্ষকদের প্রাপ্য টাকা তুলতে গিয়ে যে চরম হয়রানির শিকার হতে হতো, তার তীব্র সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, যে শিক্ষক সমাজ নীতি-নৈতিকতা আর আদর্শ শিখিয়ে লাখো কোটি শিক্ষার্থীকে মানুষের মতো মানুষ করেন, তাদেরকেই যদি শেষ বয়সে এসে ঘুষ দিয়ে টাকা তুলতে হয় বা অফিসে ঘুরে ভোগান্তি পোহাতে হয়, সেটি জাতি হিসেবে আমাদের চরম দীনতা প্রকাশ করে। তবে সেই লজ্জাজনক অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে সরকার আজ সম্পূর্ণ ভোগান্তি ছাড়াই অনলাইনে শিক্ষকদের পাওনা টাকা পাঠাতে সক্ষম হয়েছে।
অবসরকালীন সুবিধার এই টাকা বণ্টনের পথটি মোটেও সহজ ছিল না বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, পতিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী সরকার ব্যাংক-বীমার মতো শিক্ষকদের এই দুটি তহবিল থেকেও নির্লজ্জ লুটপাট চালিয়েছিল। জাল ইনডেক্স তৈরি করে এবং লুটপাটের উদ্দেশ্যে তহবিলের অর্থ দুর্বল ব্যাংকে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তারা এই ফান্ড দুটিকে কার্যত দেউলিয়া করে ফেলেছিল। এ কারণেই ২০২২ সাল থেকে শিক্ষকরা তাদের পাওনা পাচ্ছিলেন না। তবে বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফান্ডে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকদের দুরবস্থার কথা চিন্তা করে বিশেষ ব্যবস্থায় এই টাকা পরিশোধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গভীর শ্রদ্ধায় মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯১ সালে কল্যাণ ট্রাস্ট এবং ২০০২ সালে অবসর সুবিধা বোর্ড মূলত বেগম জিয়ার দূরদর্শী উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় তিনি ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে শুরু করে পর্যায়ক্রমে ৮৯ কোটি টাকার ফান্ড গঠনের মাধ্যমে এই তহবিলের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত নারী শিক্ষার জন্য বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ আজ বিশ্বজুড়েই একটি অনুকরণীয় মডেল।
শিক্ষকতার মহান পেশার প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকতা হলো একমাত্র পেশা যা অন্য সব পেশার জন্ম দেয়। প্রচলিত নিয়মে অবসরে গেলেও সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় শিক্ষকদের দায়িত্ব কখনোই শেষ হয় না। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তারা সমাজে আলোকবর্তিকা হিসেবে ভূমিকা রাখবেন বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
গুরুত্বপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এবং শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেকসহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
মন্তব্য করুন