কানাডার আলবার্টা প্রদেশে অবস্থিত সামরিক বাহিনীর একটি প্রধান ঘাঁটিতে আকস্মিক ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত চার সেনা সদস্য নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। দেশটিতে সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাকে অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
স্থানীয় সময় রোববার (১৮ অক্টোবর) জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক জরুরি ভাষণে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে একে ‘কানাডার মাটিতে সামরিক বাহিনীর জন্য অন্যতম ভয়াবহ ট্র্যাজেডি’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এর আগে শনিবার বিকেলে কানাডীয় সামরিক বাহিনীর অন্যতম ব্যস্ত ও প্রধান প্রশিক্ষণ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ‘কানাডিয়ান ফোর্সেস বেস ওয়েনরাইট’-এ (CFB Wainwright) এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। বর্তমানে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, এই ঘটনার পেছনে কোনো ধরনের ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বা নাশকতাকারীদের যোগসূত্র থাকার কোনো আশঙ্কা নেই।
প্রধানমন্ত্রী কার্নি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘‘আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর যে সাহসী বীর সন্তানদের আমরা চিরতরে হারিয়েছি, তাদের আকস্মিক প্রয়াণে পুরো জাতি আজ গভীর শোকাহত। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমাদের সমবেদনা।’’
ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসি নিশ্চিত করেছে যে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো চার সেনাসদস্য হলেন,সার্জেন্ট মরগান ওং, প্রাইভেট শন ফারেল, প্রাইভেট এইডান গোল্ডিং এবং প্রাইভেট হেইডেন লাইকমার্ক।
রোববার এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ জানান, স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন ৩৯ জন আহতের মধ্যে অন্তত ১৯ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ফলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ওয়েনরাইটের মেয়র ব্রুস পিউ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আগুন যাতে নতুন করে অন্য কোনো স্থানে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য ফায়ার সার্ভিস এবং উদ্ধারকারী দলগুলো এখনো ঘটনাস্থলে সতর্ক অবস্থানে কাজ করে যাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে মেজর জেনারেল ওয়েড রাটল্যান্ড অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে জানান, পদাতিক বাহিনীর সদস্যরা ওই সময় একটি গ্রেনেড রেঞ্জ ও অ্যাটাক রেঞ্জে ‘সরাসরি বাস্তব গোলাবারুদ ব্যবহার করে উচ্চ-তীব্রতার যুদ্ধ প্রশিক্ষণ’ মহড়া চালাচ্ছিলেন। সেই সময় প্রায় ১০ জন সেনা কাল্পনিক শত্রুর ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
তিনি জানান, ওয়েনরাইট প্রশিক্ষণ এলাকার ওই অংশে প্রচুর পরিমাণে বিস্ফোরক ও সমরাস্ত্র জমা ছিল, যার মধ্যে ছিল গ্রেনেড লঞ্চার, গ্রেনেড, ছোট আগ্নেয়াস্ত্র এবং অন্যান্য ভারী গোলাবারুদ।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, প্রশিক্ষণ চলাকালীন ওই এলাকার প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে শুকনো ঘাসে দুর্ঘটনাক্রমে আগুন ধরে যায় এবং অস্বাভাবিক শক্তিশালী ও ঝোড়ো বাতাসের কারণে সেই আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাতাসের দিক পরিবর্তন হয়ে দ্রুত তা অ্যাটাক রেঞ্জের মূল প্রশাসনিক ও আবাসিক এলাকার দিকে ধেয়ে আসে।
মেজর জেনারেল রাটল্যান্ড আরও বলেন, ‘‘ওই মুহূর্তে পুরো প্রশিক্ষণ এলাকাজুড়ে একাধিক সামরিক মহড়া ও কার্যক্রম একইসঙ্গে চলছি। আকস্মিক প্রবল বাতাসের কারণে আগুন চরম আকার ধারণ করে এবং মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।’’
ওয়েনরাইটের মেয়র ব্রুস পিউ জানান, ঘটনার দিন বিকেলে ঘাঁটির ভেতর থেকে লাগাতার ভারী কামানের গোলার শব্দ ভেসে আসছিল, যা হঠাৎ করেই চিরতরে থমকে যায়। এরপরই জরুরি পরিষেবা বিভাগগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় নামানোর খবর আসে।
প্রধানমন্ত্রী কার্নি জানান, সামরিক বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক জরুরি পরিষেবার কর্মীরা জীবন বাজি রেখে সারা রাত ধরে আগুন নেভানোর পাশাপাশি আহতদের উদ্ধারের কাজ চালিয়ে গেছেন,যা ছিল এককথায় কল্পনাতীত রকমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।
কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আহতরা সবাই প্রশিক্ষণ এলাকার (অ্যাটাক রেঞ্জ) ভেতরে উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে সংরক্ষিত বাহিনীর (রিজার্ভিস্ট) সদস্য এবং বিখ্যাত ‘প্রিন্সেস প্যাট্রিসিয়াস কানাডিয়ান লাইট ইনফ্যান্ট্রি’র সেনারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
কানাডিয়ান আর্মড ফোর্সেসের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, পুরো ঘটনাটি বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উচ্চপর্যায়ে তদন্তাধীন রয়েছে। মেজর জেনারেল রাটল্যান্ড স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই দুর্ঘটনাটি তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর সাথে কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয় এবং এর পেছনে কোনো বাহ্যিক অন্তর্ঘাত বা নাশকতার প্রমাণ মেলেনি।
উল্লেখ্য, আলবার্টার রাজধানী এডমন্টন থেকে প্রায় ২ কিলো মিটার পূর্বে অবস্থিত ‘ওয়েইনরাইট’ ঘাঁটিটি কানাডিয়ান সামরিক বাহিনীর অন্যতম প্রধান এবং কৌশলগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যেখানে সরাসরি গোলাবারুদ ব্যবহার করে মহড়া চালানো হয়। এখানে কানাডীয় সেনার পাশাপাশি মিত্র দেশের সামরিক সদস্যরাও প্রশিক্ষণ নেন। সাধারণত একটি স্বাভাবিক দিনে এই ঘাঁটিতে প্রায় ৬৯০ জন নিয়মিত সামরিক সদস্য এবং ৩০০ জন বেসামরিক কর্মী অবস্থান করেন।
এদিকে, রয়্যাল আলেকজান্দ্রা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ওয়ারেন থারস্ক সিবিসিকে জানান, এই বড় বিপর্যয়ের পর ওয়েইনরাইটের স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী চলে আসে। এডমন্টনে অবস্থিত রয়্যাল আলেকজান্দ্রা হাসপাতালে গুরুতর আহতদের স্থানান্তরের সময় সাময়িকভাবে ‘কোড অরেঞ্জ’ (বড় ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলা প্রোটোকল) ঘোষণা করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় তুলে নেওয়া হয়।
প্রাদেশিক স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা ঘটনাস্থলে সরাসরি ৩০টি মেডিকেল ইউনিট পাঠিয়েছে, যার মধ্যে ২২টি অ্যাম্বুলেন্স, ৬টি ফিক্সড-উইং বিমান এবং ২টি হেলিকপ্টার বা রোটারি-উইং ইউনিট যুক্ত ছিল। আহতদের নিবিড় পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পুরো আলবার্টার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে।
মন্তব্য করুন