মানিকগঞ্জ পৌরসভার অভ্যন্তরে অবস্থিত কুশেরচর ইসমাইল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ে এক নজিরবিহীন ও অনিয়মের তুঘলকি কাণ্ড সামনে এসেছে। বিদ্যালয়টির সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী শিক্ষক মনজুরুল ইসলাম দীর্ঘ চার বছর ধরে একবারের জন্যও বিদ্যালয়ে না গিয়েও নিয়মিত হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে যাচ্ছেন এবং সরকারি অংশের বেতন-ভাতা ঠিকই তুলে নিচ্ছেন। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, শারীরিক অসুস্থতার কারণে ওই শিক্ষক গত চার বছর ধরে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারছেন না। অনেক শিক্ষার্থী তো দূরের কথা, সহকর্মীদের কাছেও তার উপস্থিতি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অত্যন্ত অভিনব পন্থায় প্রতি বৃহস্পতিবার সকালে ওই শিক্ষকের ছোট মেয়ে বিদ্যালয় থেকে বাবার হাজিরা খাতা বাড়িতে নিয়ে যান এবং সেখানে পুরো সপ্তাহের স্বাক্ষর করিয়ে আবার তা স্কুলে ফেরত পাঠান। ফলে শিক্ষক বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থাকলেও হাজিরা খাতায় তার নিয়মিত উপস্থিতির নিখুঁত রেকর্ড থেকে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিগত বছরগুলোতে তারা সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষক মনজুরুল ইসলামকে কখনো চোখেই দেখেনি। এমনকি শিক্ষকটির চেহারা কেমন, তাও তাদের অজানা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চারশ শিক্ষার্থীর এই এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকসহ কাগজে-কলমে মোট ১২ জন শিক্ষক রয়েছে। মনজুরুল ইসলামের অনুপস্থিতির কারণে তার বিষয়ের ক্লাসগুলো সচল রাখতে স্থানীয় জাহিদ হাসান নামের এক যুবককে ‘প্রক্সি’ শিক্ষক হিসেবে রাখা হয়েছে, যাকে বিদ্যালয় থেকে মাসিক মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান স্কুল কর্তৃপক্ষের এমন অনিয়মের কথা অকপটে স্বীকার করে জানিয়েছেন যে, শিক্ষক মনজুরুল ইসলাম গুরুতর অসুস্থ এবং হেঁটে স্কুলে আসা তার পক্ষে অসম্ভব বিধায় তার বাড়িতে হাজিরা খাতা পাঠানোর বিষয়টি আইনবহির্ভূত ও ভুল হয়েছে। তবে মনজুরুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি সত্যিই শারীরিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ এবং একা চলাফেরা করতে পারেন না। নিজের মুখেই তিনি স্বীকার করেছেন যে, শারীরিক সমস্যার কারণে তার পক্ষে স্কুলে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় মেয়ের মাধ্যমে হাজিরা খাতা বাড়িতে আনিয়ে তিনি একসঙ্গে পুরো সপ্তাহের স্বাক্ষর করে দেন।
এই পুরো অনিয়মের নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী এক স্বজনের ছায়া ও পারিবারিক কোন্দল। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্থানীয় অত্যন্ত প্রভাবশালী অ্যাডভোকেট এ টি এম সাজাহানের আপন ভাতিজা হলেন অভিযুক্ত শিক্ষক মনজুরুল ইসলাম। শুধু তাই নয়, বিদ্যালয়ের বর্তমান এডহক ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি এই প্রতিষ্ঠাতারই আত্মীয়, এবং প্রতিষ্ঠাতার স্ত্রী ও অন্য ভাতিজারাও এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। এই শক্তিশালী পারিবারিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই বছরের পর বছর ধরে শিক্ষক মনজুরুল ইসলাম স্কুলে না গিয়েও বাড়তি অবৈধ সুবিধা ভোগ করে আসছেন এবং ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। এমনকি সংবাদ প্রকাশের প্রাক্কালে ওই প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠাতা প্রতিবেদককে নিউজ না করার জন্য বিভিন্নভাবে অনুরোধ জানান। এতদিন বিষয়টি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অজানা থাকলেও, বিষয়টি জানার পর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আমীর হোসেন জানিয়েছেন যে, সম্পূর্ণ অভিযোগটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে দেখা হবে এবং সত্যতার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য করুন