জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে নিজেদের সর্বশেষ কৌশলগত প্রস্তাবের প্রধান মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি একটি নতুন পরিকল্পনা নিয়ে হাজির হয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে উত্তেজনা কমানোর একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ বলে মনে হতে পারে। আরাগচির প্রস্তাব অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইরানের শর্তগুলো মেনে নিলে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও একই পরিমাণ গ্যাস পরিবাহিত হওয়া হরমুজ প্রণালি মাত্র সাত দিনের মধ্যে খুলে দেওয়া সম্ভব। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল উত্তেজনা প্রশমনের কোনো সাধারণ উদ্যোগ নয়; বরং ইরান নিজের তৈরি করা চাপকে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি করার এক সুদূরপ্রসারী কৌশল হাতে নিয়েছে।
ইরানের এই পরিকল্পনায় লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে সাত দিনের যুদ্ধবিরতি, জব্দকৃত প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার অর্থ ছাড়, তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এর বিনিময়ে ইরান ও ওমানের যৌথভাবে নির্ধারিত একটি নতুন রুটের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তেহরান মূলত মার্কিন রাজনৈতিক ক্যালেন্ডার এবং আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে এগোচ্ছে। জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দাম মার্কিন ভোক্তা ও বর্তমান প্রশাসনের ওপর যে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে, তা ভালোভাবেই বুঝতে পারছে তেহরান। তাদের হিসাব অনুযায়ী, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, হরমুজ বন্ধ রাখার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তত বেশি বাড়তেই থাকবে।
তবে এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি উন্মুক্ত জলপথকে ইরান ও ওমানের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি নির্দিষ্ট করিডরে রূপান্তর করার পাঁয়তারা। হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ হওয়া সত্ত্বেও ইরান এখন জাহাজ চলাচলের আগে নিজেদের অনুমোদন নেওয়ার দাবি তুলছে এবং যারা তা মানছে না, তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এর পাশাপাশি এই দর-কষাকষিতে ইয়েমেন ও হুতি প্রসঙ্গকে যুক্ত করা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের পক্ষ থেকে ইয়েমেনে যুদ্ধ বন্ধ করার দাবিও এই কৌশলেরই অংশ, যা তেহরানের পরিচিত ‘দ্বিমুখী কূটনীতি’ বা ভূমিকা-বিভাজনেরই প্রতিফলন। একদিকে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় নমনীয় রূপরেখা রাখা এবং অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে কঠোর অবস্থান তৈরি করা এই দুইয়ের মাধ্যমে তেহরান স্থায়ী একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে চাইছে, যা ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেছে।
মন্তব্য করুন