চলতি বছরের শুরুতে বিপিএলের সময় সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুশীলনের পর বিশ্রাম নিচ্ছিলেন রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ঠিক তখনই একটু দূর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন পেসার তাসকিন আহমেদ। হঠাৎ করেই একটু উঁচুনলায় শান্ত বলে উঠলেন, বাকি বছর কী করবে জানি না, তবে এ বছর তোমাকে অবশ্যই চারটি টেস্ট খেলতেই হবে। কিছুক্ষণ পর তাসকিন কাছে গেলে অধিনায়ক স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেন যে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে চার টেস্টের প্রতিটিতেই তিনি তাসকিনের সার্ভিস চান। এর মধ্যে প্রথম টেস্টটি শুরু হচ্ছে আজ ১৩ আগস্ট, সুদূর অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে। এরপর ২২ আগস্ট থেকে ম্যাকাওয়ে শুরু হবে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট। আর এই দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশ দল মূলত নির্ভর করবে তাদের পেস বিভাগের ওপর, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন অভিজ্ঞ পেসার তাসকিন আহমেদ। আইসিসিও আসন্ন এই সিরিজে বাংলাদেশের পেস আক্রমণের অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে চিহ্নিত করেছে তাসকিনকে।
তবে গত ৮ আগস্ট শেষ হওয়া তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচটি তেমন কোনো আশাবাদী ছবি ফুটিয়ে তোলেনি। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে ইনিংস ও ৩৮ রানের বড় ব্যবধানে হার দলের খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসে কিছুটা হলেও ধাক্কা দিয়েছে। যদিও স্কোরেজ পরিষ্কার বলে দিচ্ছে যে বোলারদের চেয়ে প্রস্তুতি ম্যাচে অনেক বেশি ব্যর্থ হয়েছে টাইগারদের ব্যাটিং লাইনআপ। প্রথম ইনিংসে ২৬৩ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানেই গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে বাংলাদেশের সফলতম বোলার ছিলেন হাসান মাহমুদ, যিনি সম্প্রতি ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেট খেলে ফিরে চার উইকেট শিকার করেন, আর পেসার তাসকিন আহমেদ নেন দুটি উইকেট। ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে নামার আগে এই ম্যাচটিকে একটি দারুণ শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন তাসকিন। সোমবার ডারউইনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান যে হারের অনুভূতি কখনো সুখের হয় না, তবে ক্রিকেটে এমনটা হতেই পারে। দ্রুত এখানকার পরিবেশ ও উইকেটের সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং পরাজয় সত্ত্বেও প্রস্তুতিটা মন্দ হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রায় ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট ম্যাচ খেলতে নামছে বাংলাদেশ দল। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর এটি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট সফর। স্বাভাবিকভাবেই প্রস্তুতি ম্যাচের হতাশা ঝেড়ে ফেলে অজিভূমে লাল বলের ক্রিকেট খেলার রোমাঞ্চে মেতেছেন ক্রিকেটাররা। বিশেষ করে পেসারদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশন সবসময়ই সহায়ক হওয়ায় তাদের মধ্যে উত্তেজনার মাত্রা একটু বেশিই। তাসকিন আনন্দের সাথে বলেন যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলার সুযোগ পাওয়াটা দারুণ সম্মানের এবং বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিপক্ষে খেলা সব ক্রিকেটারের জন্যই গর্বের বিষয়। তবে ডারউইন ও ম্যাকাওয়ের দুই ম্যাচের এই সিরিজটি যে দলের জন্য একেবারেই সহজ হবে না, সে বিষয়েও সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন তাসকিন। প্রস্তুতি ম্যাচে হারলেও ২০১৭ সালে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্ট হারানোর স্মৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারে বাংলাদেশ দল। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মোট ছয়টি টেস্ট খেলে একটিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ, যা এসেছিল মিরপুরের ঘূর্ণি পিচে। তাছাড়া গত জুনে একই মিরপুর ভেন্যুতে অস্ট্রেলিয়াকে ২-১ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজে হারিয়েছিল টাইগাররা।
অস্ট্রেলিয়া সফরের টেস্ট সিরিজের আগে সেই সাফল্যের স্মৃতি রোমন্থন করে তাসকিন বলেন যে তারা অতীতে দুর্দান্ত খেলে অজিদের হারিয়েছিলেন, যা এই সিরিজেও তাদের বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পেস আক্রমণের অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল মুখ তাসকিন ক্যারিয়ারজুড়ে বিভিন্ন চোটের সাথে লড়াই করে আজ এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছেন। একসময় এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল যে তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ার হয়তো আকস্মিকভাবেই থেমে যেতে পারে। তবে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে ২০24 সালে চার টেস্টে ১৯ উইকেট শিকার করে নিজের জাত চিনিয়েছেন তিনি। ইনজুরির কারণে গত বছর অবশ্য কোনো টেস্ট খেলতে পারেননি এই পেসার। তবুও রেড বল ক্রিকেটের প্রতি নিজের মনোযোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন তাসকিন। বছরের শুরুতে নাজমুল হোসেন শান্তর মন্তব্যই প্রমাণ করে যে চলতি বছর বাংলাদেশের টেস্ট পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিনি। গত মে মাসে মিরপুর ও সিলেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান চক্রে দুটি টেস্ট খেলে ছয় উইকেট শিকার করেছিলেন তাসকিন।
নিজের বোলিংয়ের পাশাপাশি নাহিদ রানা, শরিফুল ইসলাম এবং এবাদত হোসেনের মতো তরুণ পেসারদেরও অভিজ্ঞতা দিয়ে সাহায্য করছেন তিনি। এভাবেই ধীরে ধীরে বাংলাদেশের পেস বোলিং ইউনিটের সত্যিকারের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তাসকিন। ইনজুরির কারণে এবারের অস্ট্রেলিয়া সিরিজে নাহিদ রানা খেলতে না পারায় পেস বিভাগে দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে তাসকিনের কাঁধে। ইনিংসে দ্রুত ব্রেকথ্রু এনে দেওয়া এবং গতির মাধ্যমে প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের অস্বস্তিতে ফেলার অন্যতম প্রধান আশা ভরসা তিনিই। পেস সহায়ক পিচগুলোতে অতীতে তাসকিনের সাফল্যের খাতা খুব একটা ভারী নয়; নিউজিল্যান্ডের চার টেস্টে পাঁচ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার দুই টেস্টে দুই উইকেট রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। তবে সেই পরিসংখ্যানগুলো প্রায় চার বছর আগের। যখন খেলাটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তখন যেকোনো পেসারের মনেই স্বাভাবিকভাবে জাগবে যে এটিই হলো তাদের আসল শিকারের ভূমি
মন্তব্য করুন