ক্যারিবীয় সাগরের নীল জলরাশির মাঝে অবস্থিত ছোট্ট এক শান্ত দ্বীপ রাষ্ট্র কুরাসাও। ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটিতে জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার। বৈশ্বিক ফুটবলের মানচিত্রে দীর্ঘদিন ধরে যে দেশটির উপস্থিতি ছিল একেবারেই আড়ালে, সেই অচেনা কুরাসাও এবার ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ ও চমকে দিয়ে জায়গা করে নিয়েছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর চূড়ান্ত পর্বে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশটি শুধু নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক স্বর্ণালী অধ্যায়ই রচনা করেনি, বরং ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে পা রাখার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
কনকাকাফ অঞ্চলের বাছাইপর্বে কুরাসাওয়ের মাঠের পারফরম্যান্স ছিল সত্যিকার অর্থেই রূপকথার মতো। জামাইকা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর মতো অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী পরাশক্তিদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করে তারা গ্রুপের শীর্ষস্থান অর্জন করে। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, পুরো তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাছাইপর্বে দলটি একটি ম্যাচেও হারেনি। ধারাবাহিক সাফল্য, আধুনিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল এবং দারুণ দলগত সমন্বয়ের ওপর ভর করেই তারা নিশ্চিত করেছে বিশ্বকাপের মহামূল্যবান টিকিট। ভৌগোলিকভাবে ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূল থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটি নেদারল্যান্ডস রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশ। দীর্ঘদিনের ডাচ শাসনের কারণে দেশটির সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রায় যে ইউরোপীয় প্রভাব ছিল, তা আজ তাদের ফুটবল দর্শনেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ফুটবলে কুরাসাওয়ের ইতিহাস পুরোনো হলেও স্বাধীন পরিচয়ে তাদের আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয় মূলত ২০১১ সালে ফিফার পূর্ণ সদস্যপদ লাভের মাধ্যমে। একসময় ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের তলানিতে থাকা দলটির এই জাদুকরী পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছেন নেদারল্যান্ডসের সাবেক তারকা ফুটবলার ও কোচ প্যাট্রিক ক্লুভার্ট, যাঁর অধীনে দলটি প্রথম সংগঠিত হতে শুরু করে এবং ২০১৭ সালে ক্যারিবিয়ান কাপ জিতে নিজেদের শক্তির জানান দেয়। পরবর্তীতে এই জয়যাত্রাকে চূড়ান্ত রূপ দেন ডাচ কিংবদন্তি কোচ ডিক অ্যাডভোক্যাট। তাঁর নিখুঁত কৌশল ও জাদুকরী নেতৃত্ব কুরাসাওকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। এছাড়া দলটির অন্যতম মূল শক্তি হলো তাদের ‘ডায়াসপোরা’ বা প্রবাসী খেলোয়াড়েরা, যাঁরা নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের বিভিন্ন নামী ক্লাবে খেলে আধুনিক ফুটবলের কঠিন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
বিশ্বকাপের মূল পর্বে অবশ্য কুরাসাওকে এক অগ্নীপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। ‘গ্রুপ অফ ডেথ’-এ তাদের লড়তে হবে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি, দক্ষিণ আমেরিকার অপ্রতিরোধ্য প্রতিনিধি ইকুয়েডর এবং আফ্রিকার অন্যতম সেরা শক্তিশালী দল আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে। ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই এই গ্রুপে কুরাসাওকে 'আন্ডারডগ' হিসেবে বিবেচনা করলেও বাছাইপর্বের পারফরম্যান্স জানান দিচ্ছে, কোনো পরাশক্তিই তাদের হালকাভাবে নেওয়ার ভুল করবে না। সীমিত জনসংখ্যা ও সম্পদ নিয়ে কুরাসাও আজ যেখানে পৌঁছেছে, তা আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প হয়ে থাকবে এবং বিশ্বের অন্যান্য ছোট দেশগুলোকেও এখন বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাবে।
মন্তব্য করুন