রাজধানী ঢাকার তীব্র যানজট নিরসন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক রূপ দিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক সিগন্যাল ও ক্যামেরা ব্যবস্থা সম্প্রসারণের বড় উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পরীক্ষামূলক প্রয়োগে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর প্রথম পর্যায়ে ঢাকার ১২০টি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশন বা মোড়কে এই আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সোমবার (১৫ জুন) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন সংক্রান্ত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এই পরিকল্পনাটি উপস্থাপন করা হয়। ডিএমপির এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যৌথভাবে যুক্ত থাকবে। সভায় জানানো হয়, এই আধুনিকায়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো বরাদ্দ বা বিশেষ তহবিলের প্রয়োজন হবে না; বরং পুলিশের নিজস্ব তহবিল থেকেই এই খরচ মেটানো সম্ভব হবে। প্রধান সড়কগুলোর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করতে ধাপে ধাপে এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
ঢাকায় এআই প্রযুক্তির এই যাত্রা শুরু হয় মূলত গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর, যখন পরীক্ষামূলকভাবে জাহাঙ্গীর গেট, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর এবং হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনের মোড়গুলোতে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করা হয়েছিল।
দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার: এই সিগন্যাল বাতিগুলো সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। বাতিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনার পাশাপাশি বিশেষ প্রয়োজনে ম্যানুয়ালিও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
অর্থায়ন ও নিয়ন্ত্রণ: সিগন্যাল স্থাপনের এই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্বে থাকছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ এবং পুরো কার্যক্রমের সমন্বয় করছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকা পরিবহণ সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।
আইন লঙ্ঘন শনাক্তকরণ: চলতি বছরের ৭ মে থেকে এই পয়েন্টগুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। এই বিশেষ এআইভিত্তিক ক্যামেরায় ‘সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮’ লঙ্ঘনকারী যানবাহনগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করার জন্য উন্নত সফটওয়্যার সংযোজন করা হয়েছে। পুলিশ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এই প্রযুক্তি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
ডিটিসিএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রথম ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় অকেজো হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৬৮টি স্থানে এবং ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে আরও ৯১টি ইন্টারসেকশনে সিগন্যাল বাতি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলেও তার কোনোটিই শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এমনকি ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে জাইকার ঋণে চারটি মোড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সিগন্যাল স্থাপন করা হলেও কিছুদিন পর সেগুলোও অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে, ডিএমপির এআইনির্ভর বর্তমান উদ্যোগটি নগরবাসীর মনে স্বস্তির বার্তা দিলেও, অতীতের ব্যর্থতার ইতিহাস মাথায় রেখে এই ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
মন্তব্য করুন